২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ম্যাচের পর নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ইরান জাতীয় ফুটবল দলকে ঘিরে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দলটিকে তাৎক্ষণিকভাবে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় অবস্থিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইরানের কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়রা এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, এটি তাদের শারীরিক পুনরুদ্ধার ও প্রস্তুতি প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ইরান দল নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। প্রথমে দলটির পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার টাকসনে প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করা। তবে ভিসা জটিলতা এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কারণে শেষ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মী যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি, ফলে পূর্ণাঙ্গ সহায়ক কাঠামো নিয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি ইরান।
লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে ইরান। ম্যাচে দুবার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফেরে দলটি। মাঠের লড়াই যেমন উত্তেজনাপূর্ণ ছিল, তেমনি মাঠের বাইরেও ছিল রাজনৈতিক প্রতীক, প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন বার্তার উপস্থিতি। স্টেডিয়ামের বাইরে ইরানের বর্তমান সরকারের বিরোধিতাকারী বিক্ষোভকারীদের সমাবেশ দেখা যায়। একই সঙ্গে অনেক দর্শক ইরানের প্রাক-বিপ্লবী ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ পতাকা বহন করেন, যা বর্তমানে সরকারবিরোধী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ইরানের প্রধান কোচ আমির গালেনোয়ি জানান, ম্যাচ শেষে দলটি লস অ্যাঞ্জেলেসে রাত যাপন করে বিশ্রাম নেবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার পর তাদের জানানো হয় যে অবিলম্বে বিমানে করে তিহুয়ানায় ফিরে যেতে হবে। কোচের ভাষায়, খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারের জন্য যে সময় প্রয়োজন, সেটি তারা পাননি। তিনি এই পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক এবং দলের জন্য ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেন।
আমির গালেনোয়ি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ইরানকে ‘সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার’ দল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা সমস্যা, অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যাতায়াত জটিলতা দলটির প্রস্তুতিকে বারবার ব্যাহত করেছে। অধিনায়ক মেহদি তারেমিও দীর্ঘ ভ্রমণ, নিরাপত্তা তল্লাশি এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার বিষয় তুলে ধরেছেন।
এবারের বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে দেশটির বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এমনকি ইরান তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধও করেছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে ফিফা নির্ধারিত সূচি অপরিবর্তিত রাখে।
বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণকে ঘিরে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে সেগুলো হলোঃ
- দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়া
- কয়েকজন কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মীর ভিসা জটিলতা
- ম্যাচের পরপরই মেক্সিকোতে ফেরার নির্দেশ
- স্টেডিয়ামের বাইরে রাজনৈতিক বিক্ষোভ
- নিরাপত্তা ও ভ্রমণ সংক্রান্ত অতিরিক্ত চাপ
- ফিফার ভূমিকা নিয়ে ইরানের অসন্তোষ
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, টুর্নামেন্ট চলাকালে দীর্ঘ ভ্রমণ, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক চাপ কোনো দলের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মাঠের বাইরের এই পরিস্থিতি ইরানের বিশ্বকাপ অভিযানে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ সাধারণত ফুটবলের সর্বোচ্চ উৎসব হিসেবে বিবেচিত হলেও ইরানের বর্তমান অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক বাস্তবতা কখনও কখনও খেলাধুলার মঞ্চকেও প্রভাবিত করতে পারে। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই ফুটবলকেন্দ্রিক হোক না কেন, মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তগুলোও বড় টুর্নামেন্টের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।সংবাদের সূত্রঃ
Associated Press (AP) এবং আইরিশ নিউজ মিডিয়া।