বাংলাদেশ

হাম-সদৃশ রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশ জুড়ে স্বাস্থ্য সতর্কতা জোরদার

· · ১৮৮ বার পঠিত
হাম-সদৃশ রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশ জুড়ে স্বাস্থ্য সতর্কতা জোরদার

বাংলাদেশ জুড়ে হাম-সদৃশ রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশের বহু জেলায় রোগটির সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের আটটি বিভাগের প্রায় সব এলাকাতেই রোগটির বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই সংক্রমণ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ব্যাপক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকা এবং নিম্নআয়ের বসতিগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্তদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এমন শিশু যারা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় সম্পূর্ণভাবে টিকা পায়নি অথবা নির্ধারিত ডোজ গ্রহণ করেনি।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অনেকেই ‘জিরো-ডোজ’ বা কোনো ধরনের হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ করেনি। ফলে তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।

স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ জেলায় রোগটির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং খুলনা অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, জনসংখ্যার ঘনত্ব, টিকাদান ঘাটতি এবং দ্রুত সংস্পর্শে আসার কারণে এসব এলাকায় রোগটির বিস্তার তুলনামূলক বেশি হচ্ছে।

সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ওপর চাপও বেড়েছে। শিশু ওয়ার্ড এবং সংক্রামক রোগ চিকিৎসা ইউনিটগুলোতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু হাসপাতালে রোগীর চাপ স্বাভাবিক সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। চিকিৎসকরা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। বিভিন্ন জেলায় হাম-রুবেলা (MR) টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দ্রুত এবং ব্যাপক টিকাদান নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে শিশুদের ভিটামিন এ সরবরাহ, রোগ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি কিংবা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারেন।

শিশুদের পাশাপাশি অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ এবং টিকা না নেওয়া জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা নিশ্চিত করতে হবে এবং জ্বর, ফুসকুড়ি, চোখ লাল হওয়া বা শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে কিছু ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবার অসম প্রাপ্যতা এবং কিছু এলাকায় টিকা গ্রহণের হার কমে যাওয়ার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহামারী-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশে টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় হামসহ বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগ পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিভিন্ন জেলায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং আক্রান্ত এলাকা থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ এবং জরুরি সাড়া প্রদানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম-সদৃশ রোগের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করা। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সংক্রমণের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সংবাদের সূত্রঃ
World Health Organization (WHO), UNICEF Bangladesh, United Nations Bangladesh, International Federation of Red Cross and Red Crescent Societies (IFRC)

Enter চাপুন বা বাটনে ক্লিক করুন  ·  ESC দিয়ে বন্ধ করুন

EN
বিশ্ব কমিউনিটি বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ড খেলাধূলা তথ্য প্রযুক্তি