ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক সিগন্যাল মানার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে লাল, সবুজ ও হলুদ বাতির আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সিসি ক্যামেরা ও ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে ডিজিটাল মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ডিএমপির সাম্প্রতিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সড়কের প্রতিটি ক্রসিংয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। লাল বাতি জ্বললে কোনো অবস্থাতেই গাড়ি চালানো যাবে না। হলুদ বাতি জ্বললে চালককে গতি কমিয়ে থামার প্রস্তুতি নিতে হবে অথবা নিরাপদ অবস্থান অনুযায়ী চলাচল করতে হবে। লাল বাতিতে থামার সময় নির্ধারিত স্টপ লাইন বা জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে গাড়ি থামানো বাধ্যতামূলক।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন অতিক্রম, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, ক্রসিংয়ে যাত্রী ওঠানামা, সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, অবৈধ পার্কিং এবং বাম লেন আটকে রাখার মতো অপরাধে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রসিকিউশন বা মামলা করা হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগ থেকে ভিডিও ও স্থিরচিত্রের ভিত্তিতে অটো জেনারেটেড নোটিশ সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। একইভাবে নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী বা পণ্য ওঠানামা করলে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং চালকের লাইসেন্স থেকে ১ পয়েন্ট কর্তনের বিধান রয়েছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো বা সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড প্রযোজ্য হতে পারে।
ডিএমপি জানিয়েছে, নোটিশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালককে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় হাজির হয়ে জরিমানা পরিশোধ করে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। নোটিশ পাওয়ার পরও কেউ হাজির না হলে পরবর্তী ধাপে আদালতের মাধ্যমে সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মতো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
পথচারীদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ফুটওভার ব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিং ছাড়া যত্রতত্র রাস্তা পারাপার এবং পেডেস্ট্রিয়ান সিগন্যালের লাল বাতি অমান্য করলে ঘটনাস্থলেই ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে জরিমানা বা কারাদণ্ড হতে পারে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজের ভিত্তিতেও সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএমপি।
ট্রাফিক সিগন্যাল মানা শুধু জরিমানা এড়ানোর বিষয় নয়, এটি সড়কে মানুষের জীবন রক্ষার অন্যতম মৌলিক নিয়ম। চালক, পথচারী ও যাত্রী, সবাই নিয়ম মেনে চললে সড়কে দুর্ঘটনা, যানজট ও বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে কমে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সড়কে দীর্ঘদিন ধরে সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, ফুটপাত দখল, লেন না মানা এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার প্রবণতা যানজট ও দুর্ঘটনার বড় কারণ। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যকর হলে আইন প্রয়োগ আরও স্বচ্ছ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে চালক ও পথচারীদের সচেতনতা, নিয়মিত প্রচারণা এবং সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নও জরুরি।
ডিএমপি নাগরিকদের সতর্ক করে জানিয়েছে, সিসি ক্যামেরা বা ভিডিও মামলার নামে কোনো ব্যক্তি বা চক্র যদি মোবাইল ফোনে টাকা দাবি করে, ব্যক্তিগত তথ্য চায় বা প্রতারণার চেষ্টা করে, তাহলে নিকটস্থ থানা বা সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগে যোগাযোগ করতে হবে। জরিমানা পরিশোধ করতে হবে কেবল নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ায়।
রাজধানীর সড়কে নতুন সিগন্যাল ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হলে চালকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলোঃ লাল বাতি মানতে হবে, হলুদ বাতিতে সতর্ক হতে হবে, স্টপ লাইনের আগে থামতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই উল্টো পথে বা বাম লেন আটকে চলাচল করা যাবে না। আইন অমান্য করলে এখন শুধু রাস্তায় দায়িত্বরত পুলিশের মুখোমুখি হওয়াই নয়, ক্যামেরার ফুটেজের ভিত্তিতেও মামলা ও জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।