কমিউনিটি

সচেতনতা ও সংহতি হোক অভিবাসীদের পাথেয়

· · ৫৫৫ বার পঠিত
সচেতনতা ও সংহতি হোক অভিবাসীদের পাথেয়

কথায় আছে, পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে নিজের বাড়ির উপর দিয়ে ধোঁয়াটা হলেও বয়ে যায়। সম্প্রতি বেলফাস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাবলিনে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, তা মূলত পাশের বাড়ির উপর দিয়ে ওই ধোঁয়া বয়ে যাওয়ার মতোই অবস্থা। আয়ারল্যান্ডে বিগত কয়েক বছর যাবৎ অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন বেশ জোরেসোরেই চলছে। এর মধ্যে বেলফাস্টে ছুরিকাঘাতের ঘটনা কেবল নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড নয়, রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের আন্দোলনকেও চাঙ্গা করতে অনেকটা আগুনে কেরোসিন ঢেলে দেওয়ার মতোই!

প্রথম প্রথম কিন্তু অভিবাসীদের প্রতি আইরিশদের বেশ সহনশীল আচরণ ও সহানুভূতিশীল মনোভাব ছিল। কিন্তু কিছু কিছু অভিবাসীর নেতিবাচক আচরণ ও ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড তাদেরকে বিষিয়ে তোলে। এ ছাড়াও অভিবাসীর সংখ্যা যখন দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে, তখন তারা ক্রমান্বয়ে অভিবাসীবিদ্বেষী হয়ে ওঠে। তারা ভাবে যে, অভিবাসীরা তাদের বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছে। এটা অনেকটা শরৎচন্দ্রের সেই ‘কাদম্বিনী’ গল্পের মতো। কাদম্বিনী ছেলেপুলে নিয়ে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে তার সংসার চালাচ্ছিল। এর মধ্যে কেষ্ট নামের এক ‘উটকো ঝামেলা’ কোথা থেকে এসে তার সংসারের শান্তির বারোটা বাজিয়ে দিল! আইরিশরাও তাদের মতো করে শান্তিতে বসবাস করছিল। কিন্তু অভিবাসীরা এসে তাদের সেই শান্তি বিনষ্ট করে দিল! ভাগ বসালো খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা তথা কর্মক্ষেত্রেও। চৌকস কেউ কেউ আবার রাজনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে অনেক উপরে উঠতেও শুরু করে দিয়েছে! কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। তাদের অধীনে নেটিভ আইরিশদের খাটতে হয়। এসব মোটেও আইরিশদের চোখে ভালো ঠেকে না। ফলে অভিবাসীদের প্রতি তারা কিছুটা জিঘাংসাকাতর হয়ে ওঠে। তবে সবাই যে ওই দলের মানুষ, তা কিন্তু নয়। হয়তোবা মোট জনসংখ্যার ১৫-২০% জনগণ এর আওতাভুক্ত হতে পারে। অধিকাংশ আইরিশ অভিবাসী প্রশ্নে ইতিবাচক মনোভাবই পোষণ করেন। তাছাড়া অভিবাসীদের মধ্যেও হাজারে দু-একজন দোষী বা সহিংস প্রকৃতির লোকজনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। ওই দু-একজন বদমাশের কুকর্মের কুফল গোটা অভিবাসী সম্প্রদায়ের কাঁধে গিয়ে ভর করে। অভিবাসীদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বা কুকর্মের তালিকায় যে কটি ঘটনা স্থান পাবে, তন্মধ্যে সুদানী নাগরিক হাদি কর্তৃক সংঘটিত বেলফাস্টের ওই জঘন্যতম ঘটনাটি অন্যতম।

একজন অভিবাসীর সফলতা বা ভালো কাজ যেমন গোটা অভিবাসী সম্প্রদায়ের মুখ উজ্জ্বল করে, তেমনি কুকর্মও গোটা সম্প্রদায়ের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দেয়। সুতরাং যে ব্যক্তিটি অপকর্ম করে, তার কুফল কেবল সে একা নয়, গোটা কমিউনিটিকেই ভোগ করতে হয়। বেলফাস্টের এ ঘটনাটিই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড থেকে শুরু করে রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ড পর্যন্ত নেটিভ আইরিশদের আক্রমণ কিন্তু কেবল ওই সুদানী হাদির পরিবার বা সুদানী কমিউনিটি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। দাঙ্গা আকারে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি ভিনদেশি সম্প্রদায়ের উপরেই। কারও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়, কারও গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। অনেককে নিজের বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপনে কিংবা প্রশাসনিক সহায়তায় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এই যে বিপর্যস্ত অবস্থার সৃষ্টি হলো, এর জন্য দায়ী কে? যারা অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন করছে, তারাই কি কেবল এর জন্য দায়ী? নিশ্চয়ই না। নিজেদের ভাগ্য বদলাতে মানুষ দেশ ছেড়ে অন্য কোনো উন্নত দেশে পাড়ি জমায়। ওই উন্নত দেশটা তাদেরকে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ জীবন দান করে। ওই দেশটাতে থেকে এবং তাদের খেয়ে, তাদের পরে, তাদেরকেই যখন আঘাত হানা হয় নিজেদের উগ্র বাসনা চরিতার্থ করার জন্য, তখন তো আর অভিবাসীদের ‘নিস্পাপ মরমী’ ভাবার সুযোগ নেই। বরং নেটিভদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য অভিবাসীরাই জঘন্যতমভাবে দায়ী!

আমরা জানি, ‘ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়!’ আমার দেশে গিয়ে যদি কোনো ভিনদেশি আমার উপর আক্রমণ চালায়, গলা কেটে আমাকে মেরে ফেলতে চায়, তাহলে আমার বা আমার দেশের লোকজনের কী প্রতিক্রিয়া হবে, তা কি ভাবা যায়! কাজেই নেটিভদের অনুভূতিতে আঘাত হানে কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে এমন কোনো কাজ করা অভিবাসীদের মোটেও সমীচীন নয়। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অভিবাসীদের খুবই সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলা উচিত। সর্বোপরি অভিবাসীদের মনে রাখতে হবে, বর্নবাদের উত্তর বর্নবাদ, ঘৃণা বা সহিংসতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা, সচেতনতা ও সংহতি প্রকাশের মধ্য দিয়েই দেওয়া উচিত। প্রবাসের মাটিতে নিজেদেরকে মানবিক মর্যাদা ও সম্মানজনক স্থানে নিয়ে যেতে হলে এসব পরিশীলন ও পরিচর্যার বিকল্প নেই।

লিমরিক
১৪ জুন ২০২৬

Enter চাপুন বা বাটনে ক্লিক করুন  ·  ESC দিয়ে বন্ধ করুন

EN
বিশ্ব কমিউনিটি বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ড খেলাধূলা তথ্য প্রযুক্তি