কমিউনিটি

একটি ভাইরাল ভিডিও নয়, চার দশকের অবদানই বলে আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের প্রকৃত পরিচয়

· · ৮৯৩ বার পঠিত
একটি ভাইরাল ভিডিও নয়, চার দশকের অবদানই বলে আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের প্রকৃত পরিচয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা দেখা গেছে। তবে কোনো একটি ভিডিও, একটি পরিবার কিংবা একজন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা কখনোই একটি সম্পূর্ণ কমিউনিটির পরিচয় বহন করে না।

একটি কমিউনিটির প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার দীর্ঘদিনের অবদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর প্রদান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, মানবিক উদ্যোগ এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকার মাধ্যমে।

প্রায় চার দশক ধরে আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশিরা নীরবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে দেশটির অর্থনীতি, সমাজ ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

চার দশকের পথচলা
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে হাতে গোনা কয়েকজন বাংলাদেশি আয়ারল্যান্ডে আসেন। তখন ভাষা, আবহাওয়া, কাজ, বাসস্থান এবং সামাজিক যোগাযোগ, সবকিছুই ছিল নতুন। সীমিত সুযোগের মধ্যেও প্রথম প্রজন্মের মানুষ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন।

আজকের বাংলাদেশি কমিউনিটির ভিত্তি সেই প্রথম প্রজন্মের আত্মত্যাগ, সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
আয়ারল্যান্ডের ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ও টেকঅ্যাওয়ে শিল্পের একটি বড় অংশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অবদান রয়েছে। ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে সফল রেস্টুরেন্ট চেইন পর্যন্ত বহু প্রতিষ্ঠান স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

শুধু নিজেদের জন্য নয়, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা আইরিশ, ইউরোপীয় এবং অন্যান্য দেশের মানুষের জন্যও হাজারো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশিরা গ্রোসারি, সুপারমার্কেট, খুচরা ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি, আইটি সেবা, কনসালটেন্সি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অনলাইন ব্যবসা এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা কার্যক্রমেও সফলভাবে কাজ করছেন।

নিয়মিত কর প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান
বাংলাদেশি নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা নিয়মিত আয়কর, ভ্যাট, কর্পোরেশন ট্যাক্স, ব্যবসায়িক কর, গাড়ির কর, বীমা, বাণিজ্যিক ভাড়া এবং অন্যান্য সরকারি ফি প্রদান করে আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।

এই কর থেকেই স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো এবং অন্যান্য জনসেবার অর্থায়ন হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশি কমিউনিটিও সেই রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার।

স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশিদের অবদান
আয়ারল্যান্ডের হাসপাতাল, কেয়ার হোম, ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি ডাক্তার, নার্স, কেয়ারার, ফার্মাসিস্ট, গবেষক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিন হাজারো মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদান অনেকের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।

প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে সাফল্য
বাংলাদেশি তরুণ পেশাজীবীরা বর্তমানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সায়েন্স, ফার্মাসিউটিক্যাল, সিভিল এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন উচ্চ দক্ষতার পেশায় সফলভাবে কাজ করছেন।

অনেকেই ক্রিটিক্যাল স্কিলস এমপ্লয়মেন্ট পারমিটের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের দক্ষ কর্মীবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব
ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন, ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন, ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক, ইউনিভার্সিটি অব লিমেরিক, মেনুথ ইউনিভার্সিটি, Dundalk Institute of Technology এবং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি ডাবলিনসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক, লেকচারার ও একাডেমিক স্টাফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

পরিবহন ও দৈনন্দিন সেবায় অবদান
ট্যাক্সি, বাস, কোচ সার্ভিস, লজিস্টিকস, ওয়্যারহাউস, ডেলিভারি এবং বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে হাজারো বাংলাদেশি প্রতিদিন আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে ভূমিকা রাখছেন।

কমিউনিটি, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতি
বাংলাদেশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নতুন অভিবাসীদের সহায়তা, মানবিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে বহুসাংস্কৃতিক আয়ারল্যান্ডকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলোও শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং শিশুদের শিক্ষা, পরিবারকে সহায়তা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

মানবিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি
গৃহহীন মানুষের জন্য খাবার বিতরণ, শীতবস্ত্র প্রদান, চিকিৎসা সহায়তা, দুর্যোগকালীন তহবিল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন দাতব্য উদ্যোগে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে।

আয়ারল্যান্ড এবং বাংলাদেশ, উভয় দেশেই বিভিন্ন মানবিক সংকটে বাংলাদেশি কমিউনিটির সহমর্মিতা বহুবার প্রশংসিত হয়েছে।

স্থানীয় গণতন্ত্রেও বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া একাধিক ব্যক্তি বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

লিমেরিক সিটি ওয়েস্ট এলাকার কাউন্সিলর আবুল কালাম আজাদ তালুকদার, ডানলরী-রাথডাউন কাউন্টি কাউন্সিলের কাউন্সিলর কাজী আহমেদ এবং ক্লোনাকিল্টির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ইউসুফ জানাবালির মতো ব্যক্তিত্বরা দেখিয়েছেন যে সততা, পরিশ্রম এবং জনসেবার মাধ্যমে অভিবাসীরাও স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেন।

নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা
আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া কিংবা বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা, গবেষণা, সরকারি সেবা এবং উদ্যোক্তা খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তারা একই সঙ্গে বাংলাদেশি ঐতিহ্য এবং আইরিশ সমাজের মূল্যবোধ ধারণ করে একটি আরও সমৃদ্ধ বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছে।

একটি ভিডিও নয়, একটি ইতিহাস
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি ভিডিও অল্প সময়ের জন্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিতে পারে। কিন্তু একটি কমিউনিটির প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে বহু বছরের পরিশ্রম, সততা, কর প্রদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে।

আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের চার দশকের ইতিহাস সেই দীর্ঘ যাত্রারই সাক্ষ্য বহন করে। হাজারো মানুষের নীরব পরিশ্রম, সফলতা এবং ইতিবাচক অবদানই আজ এই কমিউনিটির সবচেয়ে বড় পরিচয়।

বাংলা বার্তার দৃষ্টিতে
যে কোনো সমাজে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে এবং তা নিয়ে আলোচনা হওয়াও স্বাভাবিক। তবে একটি ব্যক্তি, একটি পরিবার বা একটি ভাইরাল ভিডিও দিয়ে পুরো একটি কমিউনিটিকে বিচার করা ন্যায়সঙ্গত নয়। তথ্য, পরিসংখ্যান, বাস্তব অর্জন এবং দীর্ঘদিনের ইতিবাচক অবদানই একটি কমিউনিটির প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে। আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের ইতিহাসও সেই ইতিবাচক অবদানের ইতিহাস।

সংবাদের সূত্রঃ
Bangladeshis in Ireland (https://bangladeshisinireland.com/) এর ঐতিহাসিক সংরক্ষণ প্রকল্প, বাংলাদেশি কমিউনিটির নথিভুক্ত অবদান ও ঐতিহাসিক তথ্য।

Enter চাপুন বা বাটনে ক্লিক করুন  ·  ESC দিয়ে বন্ধ করুন

EN
বিশ্ব কমিউনিটি বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ড খেলাধূলা তথ্য প্রযুক্তি