কমিউনিটি

কুমিল্লা বা আঞ্চলিক সংগঠনঃ মানবিক সুষমায় হয়ে উঠুক আরও নন্দিত

· · ৩০৫ বার পঠিত
কুমিল্লা বা আঞ্চলিক সংগঠনঃ মানবিক সুষমায় হয়ে উঠুক আরও নন্দিত

গতকাল যা অস্বাভাবিক ছিলো, আজ তা স্বাভাবিক। আজ যা, আগামীকাল তা অস্বাভাবিক। এই যে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিকতার দোলাচল, একে নিয়ন্ত্রণ করছে সময়। “সময়” এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এই নিয়ামকের ফলে অনেক কিছুর পরিবর্তন বা রদবদল ঘটে। ধ্বংস ও সৃষ্টি দুটোই নির্ভর করে সময়ের দাবির উপর। পৃথিবীতে অনেক কিছুর মতো এই যে আমরা শত-সহস্র রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠন দেখতে পাই তাও মূলত সময়ের দাবির উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠেছে। আয়ারল‍্যান্ডস্থ কুমিল্লা ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনটি বস্তুত এমনই একটি সময়ের দাবির ফসল।

যে কোনো ধরনের একটি সংগঠনকে প্রতিষ্ঠাকরণ, সফল কার্যক্রমের মাধ্যমে একে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ মোটেও সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন হিম্মত, শক্তি, ঐক্য ও বুদ্ধিমত্তার। প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করছি। সম্ভবত বছর দুই-তিন আগে “বৃহত্তর ময়মনসিংহ কল্যাণ পরিষদ” নামে একটি সংগঠন গঠনের জন্য আমরা কয়েকজন প্রচেষ্টা চালাই। দুটো বা তিনটি মিটিংও করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংগঠনটি আর আলোর মুখ দেখতে পারেনি। কেনো পারেনি? কারণ, সংগঠন বা সংস্থা গঠনের জন্য যে ঐক্য, সমভাবনা, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা এবং হিম্মত বা শক্তির প্রয়োজন, আমাদের মধ্যে তার ঘাটতি ছিলো। পক্ষান্তরে, একইভাবে যদি আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি তাও সম্ভবত অপ্রাসঙ্গিক হবেনা। আপনারা ইতোমধ্যে অনেকেই অবগত আছেন যে, আয়ারল্যান্ডে “সাহিত্যসভা” নামে একটি প্ল্যাটফর্মের বিকাশ ঘটেছে। ২০১৪/২০১৫ সাল থেকেই এ রকম একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ সাহস বা হিম্মতের অভাবে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে যখন নিজেকে সাহসী করে তুলি তখনই এর সফল অঙ্কুরোদগম ঘটাতে সক্ষম হই। মাথায় ভাবনাটি আসার প্রায় নয় বছর পর ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সভাটি তার যাত্রা শুরু করে।

উপরে উল্লেখিত ঘটনাবলী থেকে সহজেই অনুমেয় যে, বৃহত্তর কুমিল্লা ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনকে গড়ে তোলা এবং এর সৃষ্টিলগ্ন থেকে অদ্যাবধি একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটা মোটেও সহজ ও মসৃণ নয়। তবু “কঠিনেরে” ভালোবেসে কুমিল্লাবাসী সংগঠনটির সফলতার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে তাদের এই “চেষ্টার” প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। আমার যতদূর মনে পড়ে, ২০২২ সালে লিমরিকের গ্রীনহিল হোটেলে এক জাঁকজমক পরিবেশে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। আনুষ্ঠানিক কোনো কার্যকরী কমিটি না থাকলেও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সংগঠনটির হাল ধরে এগিয়ে নিয়ে যান জনাব আক্তার হোসেন। অবশ্যই সম্প্রতি তাকে সভাপতি ও মুজিবুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে সংগঠনটির স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়। স্থায়ী কমিটি গঠিত হওয়ার পর সম্ভবত এই প্রথম ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে “প্রবাসীদের মিলনমেলা ও গুণীজন সংবর্ধনা” অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রমের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তবে যাত্রালগ্ন থেকেই সংগঠনটি বহুমাত্রিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। আলোচনা এবং উৎসাহ ও শুভেচ্ছা বৃষ্টিতে সংগঠনটিকে ভেজানোর স্বার্থে তাদের উল্লেখযোগ্য কিছু কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি পাঠককুলের সামনে তুলে ধরতেই হয়।

২০২২ সালের পর এ পর্যন্ত সংগঠনটি শীতবস্ত্র ও রমাদান উপহার বিতরণ, গাজা ও ফিলিস্তিনে প্রায় €৮,৩০০, তুরস্কের ভূমিকম্পে €৮,০০০ অনুদান প্রদান, বন্যাকবলিত কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালীতে ১৫টি ঘর নির্মাণ, দারিদ্র্যবিমোচন প্রকল্পের আওতায় ৬টি রিকশা বিতরণ এবং এক অসহায় শিশুর হার্ট অপারেশনের জন্য ২ লক্ষ টাকা সহায়তা প্রদান করে।

প্রবাসে সম্প্রীতি গড়ার লক্ষ্যে তারা নিয়মিত ইফতার মাহফিল, ঈদ পুনর্মিলনী, বনভোজন ও প্রবাসী মিলনমেলার আয়োজন করেছে। তারাই ২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ডে প্রথমবারের মতো কবি ও সাহিত্যিকদের সম্মাননা প্রদান এবং ২০২৬ সালে ১১ জন গুণীজনকে “গুণীজন অ্যাওয়ার্ড” প্রদান করে।

সত্যের খাতিরে বলতেই হয়, আইরিশ আবহাওয়ার সদয়ানুকূল্যের কারণে এবারের মিলনমেলাটি বেশ জমজমাট ও উপভোগ্য হয়ে ওঠলেও “গুণীজন সংবর্ধনা” এপিসোডটি অনেকের কাছেই বেশ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। মাইকের সাউন্ড সিস্টেম ছিলো একেবারেই বাজে। অগোছালো ও হযবরল টাইপের অনুষ্ঠানটি গোটা মিলনমেলার স্বাদটাকেই তেতো করে দিয়েছিলো। তাছাড়া কিসের ভিত্তিতে বা কোন মাপকাঠিতে “গুণীজন” বাছাই করা হয়েছিলো সে ব্যাপারেও অডিয়েন্সে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়নি। গুণীজনদের যখন সম্মান বা সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিলো তখন বিউগলের কোনো সম্মানসূচক সুর বাজানো হয়নি। অনেক বেরসিক সমালোচকের মতে, আয়ারল্যান্ডে হাইপ্রোফাইল সম্পন্ন আরও বহু গুণীজন রয়েছেন যাদেরকে সম্মাননার আওতায় আনতে পারলে সংগঠনটি নিজেই সমৃদ্ধ ও সম্মানিত বোধ করতে পারতো। তবে সমালোচনা যাই হোক না কেনো, তারা শুরু করেছে সেটাই বড়ো কথা। প্রথম প্রথম কিছু ভুলভ্রান্তি থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভবিষ্যতে এসব স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তারা আরও সতর্ক থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস।

কুমিল্লা এসোসিয়েশনের মতো তুলনামূলক ছোট বা আঞ্চলিক সংগঠনগুলো নিয়ে অনেকের এক ধরনের বাতিক রয়েছে। তারা মনে করেন, এসব সংগঠন আমাদের কেন্দ্রীয় সংগঠন, অল বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড (আবাই)-এর প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমার ধারণা সম্পূর্ণ উল্টো। প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং ব্রাদার বা সিস্টার সংগঠন হিসেবে আবাই-এর পরিপূরক হয়ে কাজ করবে। আমার ধারণার পক্ষে কয়েকটি নৈতিক ব্যাখ্যা দিই।

  • অর্থনীতির ভাষায় বলা যায়, নিজেকে সাহায্য করার অর্থই হচ্ছে অন্যকে সাহায্য করা। সে আলোকে কুমিল্লা এসোসিয়েশন বা এরকমের অন্যান্য সংগঠনগুলো যখন নিজেরা নিজেদের সাহায্য করে, তখন তাদের ওই “সাহায্য” প্রকারান্তরে সমাজকে সাহায্য করার সামিল বলেই বিবেচিত হয়।
  • কেন্দ্রীয় সংগঠনটি যদি কোনো প্রয়োজনে কুমিল্লাবাসী বা অন্য যে কোনো এলাকাবাসীর সাথে বসতে চায়, কথা বলতে চায় কিংবা মতবিনিময় করতে চায়, তবে সে ক্ষেত্রে সংগঠনটিকে জনে জনে কথা না বলে আঞ্চলিক সংগঠনের দু-একজন মুখ্য ব্যক্তির সাথে কথা বলেই তাদের প্রয়োজনীয়তা সেরে নিতে পারে।
  • সবার আগে আপনজনকে সাহায্য-সহযোগিতার কথাটি ধর্মেও রয়েছে। প্রথমে নিজের ঘর, বাড়ি, প্রতিবেশী, তারপর বাইরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ধর্ম মানুষকে উৎসাহিত করেছে। সে প্রেক্ষাপটে বলাই যায়, আঞ্চলিক সংগঠনগুলো শরীয়ত বা ধর্মীয় বিধান রক্ষা করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
  • কুমিল্লা এসোসিয়েশন বা অন্য যে কোনো আঞ্চলিক সংগঠনই হোক, তারা যখন কোনো অনুষ্ঠান করেন তখন সেখানে কেবল ওই বিশেষ এলাকার লোকজনই জড়ো হন না, বরং গোটা বাংলাদেশের প্রবাসীবৃন্দ একত্রিত হন। পরিণত হয় মিলনমেলায় তথা একখণ্ড বাংলাদেশে।

প্রবাসের মাটিতে এক খণ্ড বাংলাদেশে রূপান্তরিত করার কাজটি করে যাওয়াও কিন্তু কম কথা নয়। সুতরাং কুমিল্লা এসোসিয়েশনসহ যেসব সংগঠন এ ধরনের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে তাদেরকে সাধুবাদ ও অভিনন্দন জানাতেই হয়। তারা ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির বন্ধন বজায় রেখে এগিয়ে চলবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এবারের কুমিল্লা প্রোগ্রামে গোচরীভূত একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। কুমিল্লার অধিবাসী নন এমন অনেক লোককে যেমন অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছে, তেমনি অনেক নেতৃস্থানীয় কুমিল্লাবাসীকেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি। বিষয়টি অনেকের মনে প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাদের এ স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না। তবে আমরা আশা করবো, ভবিষ্যতে ঐক্যের বন্ধনকে আরও গুরুত্ব ও মর্যাদা দিয়ে সংগঠনটি সামনের দিকে এগিয়ে চলবে। অন্যান্য সংগঠনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ঐক্য, সম্প্রীতি, মানবতা ও সত্যচেতনার ধারক-বাহক হয়ে স্বীয় সুষমা এবং মহিমায় সংগঠনগুলো হয়ে উঠুক আরও কল্যাণমুখী, আরও নন্দিত।

লিমরিক
২৩ জুলাই ২০২৬

Enter চাপুন বা বাটনে ক্লিক করুন  ·  ESC দিয়ে বন্ধ করুন

EN
বিশ্ব কমিউনিটি বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ড খেলাধূলা তথ্য প্রযুক্তি