আমরা সাধারণত টেলিভিশনে, মঞ্চে, সিনেমায় কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করি। অনুষ্ঠানের চাকচিক্য, সফলতা কিংবা ব্যর্থতা আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু একটি আয়োজনকে সফলভাবে সম্পন্ন করতে কিংবা মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে কত মানুষের সময়, শ্রম, ঘাম, ত্যাগ ও তিতিক্ষা জড়িয়ে থাকে, তা আমরা খুব কমই ভাবি।





গত ২৫ ও ২৬ এপ্রিল ২০২৬-এ অল বাংলাদেশী অ্যাসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড (ABAI) আয়োজিত কনস্যুলার সার্ভিস কার্যক্রমও কি শ্রম ও ত্যাগ ছাড়া সম্পন্ন হয়েছে? নিশ্চয়ই নয়। লিমরিক কাউন্টি কাউন্সিল হলের ভেতরের সুশৃঙ্খল, কর্মচঞ্চল ও প্রাণবন্ত পরিবেশ দেখে মনে হয়েছে এটি কেবল একটি সাধারণ কার্যক্রম নয়, বরং অত্যন্ত পরিপাটি ও সুসংগঠিত এক মানবিক আয়োজন।
এই আয়োজনকে আরও সফল ও স্মরণীয় করে তুলতে যারা নেপথ্যে থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁদের কথা আজ বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয়।
আবাইয়ের সভাপতি মোহাম্মাদ মোস্তফা এবং সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক আনোয়ারের নেতৃত্বে সারোয়ার মোর্শেদ, শাহীন রেজা, আজমল হুসাইন, মাসুদ শিকদার, আব্দুল জলিল, আব্দুর রহিম, কবির আহম্মেদ, গিয়াস উদ্দিন, কামাল, অনয়, মিটুসহ অসংখ্য সদস্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত কাজ, চাকরি কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব সাময়িকভাবে পাশে রেখে দুই-তিন দিনের জন্য লিমরিকে এসে অবস্থান করেছেন। এমনকি সভাপতি নিজেও দুই দিন আগে এসে হোটেলে ওঠেন, যেন প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি না থাকে।
সংগঠনের বাইরেও অনেকেই সহযোগিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মনিরুল ইসলাম মনির, শাহাবুদ্দিন শিহাব, নজরুল ইসলাম, সাইফ, শরীফ, ওমর ফারুক নিউটন, আলামিন, রাকিব, লিওন ও সাদিয়াসহ আরও অনেকে।
এমন বড় আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল অতিথি আপ্যায়ন। প্রথম দিনের দুপুরে কনস্যুলার টিমের সদস্য, স্থানীয় অতিথি এবং বিভিন্ন কাউন্টি থেকে আগত সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্য সুস্বাদু খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহের পুরো দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন আবাইয়ের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক আনোয়ারের স্ত্রী আনিকা বন্যা। দুই শিশু সন্তানকে সামলে এত সুন্দরভাবে রান্না, প্যাকেটিং এবং খাবার সরবরাহের কাজ সম্পন্ন করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তাঁর প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
রাতের খাবারের আয়োজনও ছিল অনন্য। রাত নয়টা থেকে শুরু হয়ে তা চলে প্রায় রাত একটা পর্যন্ত। অতিথিদের আন্তরিক আপ্যায়নের মাধ্যমে যিনি নিজেকে একজন দক্ষ রন্ধনশিল্পী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তিনি হলেন আবাইয়ের লিমরিক আঞ্চলিক সদস্য আজমল হুসাইনের স্ত্রী খোদেজা হুসাইন রাখি।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটার দিকে লন্ডন থেকে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ড. নজরুল ইসলাম এবং তাঁর এক সহযোগী সেখানে উপস্থিত হন। তাঁদেরও যথাযথভাবে আপ্যায়ন করা হয়। খাবার শেষে তাঁদের সঙ্গে হাইকমিশন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আইরিশ সরকারের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠককে ঘিরে বিভিন্ন পরামর্শও তিনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং নোট নেন। আলোচনা ও আপ্যায়ন পর্ব শেষ হয় প্রায় রাত দুটোর দিকে।
এই নিঃস্বার্থ অবদান ও নীরব ত্যাগ কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আনিকা বন্যা কিংবা রাখি হুসাইন কেবল তাঁদের স্বামীদের সমাজসেবায় উৎসাহিত করেই থেমে থাকেননি, বরং নিজেরাও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদের প্রতি রইল প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা।
দ্বিতীয় দিনের দুপুরে নিজস্ব রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার সরবরাহ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন বাংলাদেশ কমিউনিটি অব লিমরিকের সভাপতি আব্দুল মমিত। তাঁর সঙ্গে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শাকিল চৌধুরীসহ যারা কনস্যুলার সার্ভিসকে সহযোগিতার মাধ্যমে আরও গতিশীল করেছেন, তাঁদের প্রতিও রইল ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
গলওয়ের কবির আহম্মেদ কোনো আনুষ্ঠানিক পদবী ছাড়াই যে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। মাননীয় হাইকমিশনার, মিনিস্টার এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের রিসিভ করা, প্রটোকল নিশ্চিত করা, সমন্বয় রক্ষা এবং কাউন্সেলিং কার্যক্রমকে গতিশীল করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। প্রকৃত অর্থেই তিনি দায়িত্বশীলতার উজ্জ্বল উদাহরণ।
এ ছাড়া আবাইয়ের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব হামিদুল নাসির ও সাইফুল ইসলাম উপস্থিত থেকে সেবা কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন।
এই আয়োজনকে সম্মানিত করেছেন লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ড. নজরুল ইসলাম, আইরিশ সিনেটর ডি. রায়ান (Dee Ryan), লিমরিক কাউন্টি কাউন্সিলের মেয়র জন মোরান (John Moran) এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর আজাদ তালুকদার।
এটাই ছিল আয়ারল্যান্ডের কোনো সরকারি ভবনে অনুষ্ঠিত প্রথম বাংলাদেশি কনস্যুলার সার্ভিস। এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন লিমরিক কাউন্টি কাউন্সিলের কাউন্সিলর আজাদ তালুকদার, যিনি সাবেক ডেপুটি মেয়র ও সিটি মেয়রও ছিলেন। তবে আমি শুধু তাঁকেই ধন্যবাদ দিতে চাই না, ধন্যবাদ জানাতে চাই তাঁর কয়েকজন আইরিশ নেটিভ স্টাফকেও। সপ্তাহান্তের ছুটি উপেক্ষা করে তাঁরা প্রায় বারো ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করেছেন শুধুমাত্র কাউন্সিল হল খোলা রাখার জন্য। আয়ারল্যান্ডের সব বাঙালির পক্ষ থেকে তাঁদের জানাই স্যালুট।
আবাইয়ের তত্ত্বাবধানে এবার সম্ভবত ষষ্ঠবারের মতো কনস্যুলার সার্ভিস অনুষ্ঠিত হলো। আগের আয়োজনগুলোও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে এবারের আয়োজন আমার কাছে আরও বেশি পরিশীলিত ও পেশাদার মনে হয়েছে।
লন্ডনে অফিস শেষে শুক্রবার বিকেলে ফ্লাইটে আয়ারল্যান্ডে এসে শনি ও রোববার ছুটির দিনগুলো কাজে ব্যয় করা নিঃসন্দেহে বড় ত্যাগের বিষয়। অথচ তাঁদের মধ্যে ক্লান্তি বা বিরক্তির কোনো ছাপ দেখা যায়নি। তাঁদের প্রতিও কমিউনিটির পক্ষ থেকে রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
কনস্যুলার সেবা শেষে ২৬ এপ্রিল রাত নয়টার দিকে লিমরিক কাউন্টি কাউন্সিল ভবনের চেম্বার হলে মিনিস্টার (কনস্যুলার) ব্রিগেডিয়ার হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিনি পোস্টাল চার্জ বাবদ ১৫ ইউরো নগদ নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। ভবিষ্যতে আয়ারল্যান্ড থেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করার আশ্বাসও দেন। পাশাপাশি আইরিশ ভিসাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য কমিউনিটি নেতাদের লন্ডন হাইকমিশনে আমন্ত্রণ জানান।
তিনি জানান, এবারের কনস্যুলার সার্ভিস থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রায় চল্লিশ হাজার ইউরোর বেশি রাজস্ব অর্জন করেছে। অরাজনৈতিক ধারা বজায় রেখে আবাই যে সুশৃঙ্খল ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে, সে জন্য তিনি সংগঠনটির ভূয়সী প্রশংসা করেন।
আমি আবাইয়ের প্রশংসা করতে চাই না। তবে কয়েক বছর আগে লিখেছিলাম, “আবাই একদিন মহীরুহে পরিণত হবে।” আজ মনে হচ্ছে, সংগঠনটি সত্যিই সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।
কনস্যুলার সেবাকে কেন্দ্র করে আবাইয়ের এই “কর্মযজ্ঞ” কেবল কর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি পরিণত হয় প্রবাসী বাঙালিদের মিলনমেলায়, এক অনন্য মানবিক উৎসবে। তবে এটি কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় উৎসব নয়। আমি বরং একে বলতে চাই, “মানবিক উৎসব” — সেবাদানের এক নিখুঁত উপমা।লিমরিক