আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে বাংলাদেশী কমিউনিটির অন্যতম সক্রিয় সামাজিক সংগঠন ‘ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটি’ ৯ জুন অনুষ্ঠিত তাদের বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। কমিউনিটির সদস্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ সভায় সংগঠনের গত বছরের কার্যক্রম, আর্থিক হিসাব, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।




সভায় সভাপতিত্ব করেন ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটির সভাপতি মাজহারুল মোল্লাহ জিনুক এবং অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইমান আলী দিলদার। উপস্থিত সদস্যদের সামনে সংগঠনের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
২০১৮ সালে যাত্রা শুরু
ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে আয়ারল্যান্ডে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশী নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধ তুলে ধরা এবং কমিউনিটির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক সংহতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সমাজসেবা ও মানবিক সহায়তায় সক্রিয় ভূমিকা
সংগঠনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো কমিউনিটির সদস্যদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো। কোনো সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে কিংবা পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করলে ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটি মানবিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। বিশেষ করে দাফন-কাফন, প্রশাসনিক সহায়তা এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের ক্ষেত্রে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
সভায় জানানো হয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে কমিউনিটির চারজন সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংগঠনটি সর্বাত্মকভাবে তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে।
সচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটি সদস্যদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান সম্প্রসারণ এবং তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। কমিউনিটির সদস্যদের প্রয়োজন ও সময়োপযোগী বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা এবং আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উদ্যোগ হলোঃ
- হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কিত সচেতনতামূলক সেমিনার
- ক্যান্সার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে আলোচনা অনুষ্ঠান
- তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণামূলক ক্যারিয়ার সেমিনার
- শিক্ষা, পেশা ও নেতৃত্ব বিকাশ বিষয়ক কর্মসূচি
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কমিউনিটির সফল চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও অন্যান্য পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়, যাতে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করতে পারে এবং উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত হয়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রশংসনীয় উদ্যোগ
কোভিড-১৯ মহামারির কঠিন সময়ে ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটি বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। সংগঠনের সদস্যরা চেরি অরচার্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি স্থানীয় গার্ডা স্টেশনগুলোর সদস্যদের প্রতিও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। এ উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে এবং বাংলাদেশী কমিউনিটির ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
সদস্যসংখ্যা ও সাংগঠনিক কাঠামো
বর্তমানে ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটির সদস্যসংখ্যা ৭৪ জন। সংগঠনের তহবিল মূলত সদস্যদের বার্ষিক চাঁদা ও সদস্যপদ ফি থেকে পরিচালিত হয়। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রেখে সদস্যদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগঠন পরিচালনা করা হচ্ছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। সদস্যপদের মাধ্যমে কমিউনিটির সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং সদস্যদের অবদানেই সংগঠনের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সভায় সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছেঃ
- তরুণ প্রজন্মের জন্য আরও বেশি শিক্ষামূলক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা
- বাংলাদেশী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন
- কমিউনিটির জন্য নিজস্ব কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
- ভবিষ্যতে নিজস্ব কবরস্থানের জন্য জমি সংগ্রহের পরিকল্পনা
- সামাজিক ও মানবিক সেবামূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ
নেতৃবৃন্দ জানান, দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থায়ী কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা এবং কমিউনিটির প্রয়োজন বিবেচনায় নিজস্ব কবরস্থানের জন্য জমি সংগ্রহের বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকারমূলক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডাবলিনজুড়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্য
বর্তমানে সংগঠনটি মূলত ক্লনডালকিন, লুকান, অ্যাডামসটাউন, পালমারস্টাউন, নিউক্যাসল এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সদস্যভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে ভবিষ্যতে পুরো ডাবলিনজুড়ে কার্যক্রম বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি ও বক্তব্য
বার্ষিক সাধারণ সভায় আয়ারল্যান্ডের বাংলাদেশী কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অল বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অফ আয়ারল্যান্ডের সভাপতি মোঃ মোস্তফা, সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ডা. জিন্নুরাইন জায়গীরদার, সাবেক আহ্বায়ক হাজী তাজুল ইসলাম, সহ-সভাপতি হারুন খান, সহ-সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন আহমেদ, কমিউনিটি নেতা ও আয়ারল্যান্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি হামিদুল নাসির, অল বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অফ আয়ারল্যান্ডের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল জলিল এবং সহ-সভাপতি আজিজুর রহমান মাসুদ।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিডিএডি'র সভাপতি জহিরুল ইসলাম জহির, বিডিএডি'র সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া প্রধান, বাংলাদেশ স্পোর্টস এসোসিয়েশন অফ আয়ারল্যান্ডের সভাপতি চুন্নু মাতাব্বর, বিসিডি'র উপদেষ্টা জুবায়েদ মাহমুদ ফিরোজ দিপু, মোঃ ইয়াসিন মামুন, মফিজুর খন্দকার, সাইফুল ইসলাম, আলমগীর হোসেন, হারুন ইমরান, রফিক উল্লাহ, আব্দুল মোতালেব এবং রুহুল তালুকদারসহ কমিউনিটির আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি। বক্তারা ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে বৃহত্তর বাংলাদেশী কমিউনিটির কল্যাণে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ কামাল হোসেন বিগত বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন করেন এবং সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার বিষয়টি সভায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
সভা শেষে সদস্যরা সংগঠনের চলমান কার্যক্রমের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও কমিউনিটির কল্যাণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে সংগঠনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে বিভিন্ন মতামত ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়।
ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটির কার্যক্রম প্রমাণ করে যে প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার উদ্যোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সভাপতি মাজহারুল মোল্লাহ জিনুক এবং সাধারণ সম্পাদক ইমান আলী দিলদারের নেতৃত্বে সংগঠনটি শুধু একটি সামাজিক সংগঠন হিসেবেই নয়, বরং কমিউনিটির ঐক্য, মানবিক সহায়তা এবং নতুন প্রজন্মের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।সংবাদের সূত্রঃ
ইন্সপায়ার্ড কমিউনিটি, ডাবলিন এর বার্ষিক সাধারণ সভার উপস্থাপিত তথ্য; সংগঠনের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য।