আয়ারল্যান্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটির সবচেয়ে পুরোনো ও পরিচিত সংগঠন অল বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড—সংক্ষেপে আবাই—আবারও আলোচনায়। নতুন পরিকল্পনা, ডিজিটাল রূপান্তর, মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, ঐক্য ও সংহতির মতো শব্দ এখন বেশ উচ্চকিত। এসব শুনতে ভালো লাগে। ভালো কথার বাজারে এখনো মন্দা পড়েনি। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, ভালো কথা আর ভালো কাজের মধ্যে অনেক সময় আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকে। সেই কারণেই পুরোনো প্রশ্নটি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে— এই আবাই নিয়া আমরা কি করিব?
প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার আগে একটি ছোট্ট গল্প বলা যাক। কারণ, অনেক সময় গল্পই এমন কিছু সত্য প্রকাশ করে, যা সভার দীর্ঘ বক্তৃতা কিংবা ফেসবুকের সুদৃশ্য পোস্টে ধরা পড়ে না। আমার স্কুলজীবনের একটা বড় সময় কেটেছে শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) হাই স্কুলে। দুপুরের বিরতিতে আমার খুব প্রিয় খাবার ছিল মুড়ি আর গুড়। সস্তা, সহজলভ্য, অল্প খেলেই পেট ভরে যায়।
সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে বিকল্পও ছিলনা। কিন্তু কিছুদিন পর আবিষ্কার করলাম, পেট ভরলেও বেশিক্ষণ তৃপ্তি থাকে না। কিছুক্ষণ পরই আবার খিদে এসে হাজির। একদিন দাদাকে বিষয়টি বলতেই তিনি হেসে বললেন, "নাতি , সস্তায় পাওয়া বেশি খাবার ক্ষণিকের জন্য পেট ভরায়, কিন্তু শরীরের শক্তি ধরে রাখতে পারে না। অল্প খাও, কিন্তু ভালো খাও।" সেদিন দাদার ছোটো কথা বুঝিনি, আজ বুঝি—কথাটা শুধু খাবারের জন্য নয়, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের জন্যও সমান সত্য।
একটি ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য শুধু সদস্যসংখ্যা কিংবা বড় বড় পদবির প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় চিন্তাশীল মানুষের। কারণ, কোনো প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, তার কমিঠি নয়, তার ব্যানার নয়, তার ফেসবুক পেজও নয়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার Collective Intellectual Capital—তার সামষ্টিক বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি। দুঃখজনকভাবে সত্য, এই জায়গায় আবাইকে কখনো পূর্ণাঙ্গ মনে হয়নি আমার। হয়তো অতীতে দুই-একজন মেধাবী মানুষ ছিলেন, এখনও আছেন। কিন্তু দুই-একজন মানুষ দিয়ে কোনো জাতীয় সংগঠন দাঁড়ায় না। সেখানে প্রয়োজন একটি সম্মিলিত চিন্তাশক্তি, যেখানে অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, নতুন প্রজন্মের উদ্যম এবং মুক্ত চিন্তা একত্রে কাজ করবে।
বরং আবাই নিয়ে যখন কথা হয় তখন আমার মনে হয় এর সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের নয়, জনবলেরও নয়। এর সবচেয়ে বড় সংকট সাংগঠনিক দর্শনের। যে বাড়ির নকশাতেই সমস্যা, সেখানে নতুন রঙ করলেই বাড়ি শক্তিশালী হয় না। বর্তমান সংবিধানে আবাইকে একটি "আমব্রেলা সংগঠন" বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর কার্যক্রম অনেকাংশেই একটি একক সংগঠনের মতো। আমব্রেলা না একক—এ নিয়ে আমার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। আমার প্রশ্ন আরও মৌলিক। আবাই আসলে কী হতে চায়? এর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী?কোন সাংগঠনিক দর্শনের ভিত্তিতে এটি পরিচালিত হবে? এই প্রশ্নগুলো তুললেই কেউ কেউ এমন প্রতিক্রিয়া দেখান ,যেন কোনো মহাজ্ঞানীর রচিত বেদবাক্যে হাত পড়ে গেছে। যেন প্রশ্ন তোলা মানেই বেয়াদবি । অথচ পৃথিবীর কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। বরং প্রশ্নহীনতাই প্রতিষ্ঠানের মৃত্যুর শুরু।
আবাইয়ের গত তৃতীয় কার্যকরী নির্বাচনের সময় অনেকের মতো আমিও আশাবাদী ছিলাম। মনে হয়েছিল, শুধু মুখ নয়, এবার হয়তো চিন্তারও পরিবর্তন হবে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সীমা ছাড়িয়ে আবাই একটি দক্ষ, আধুনিক ও কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে। কিন্তু কয়েক মাসের কর্মকাণ্ড দেখে বারবার একটি পুরোনো প্রবাদ মনে পড়ে— যে লাউ সেই কদু। হয়তো মুখ বদলেছে, কিন্তু অলিখিত নীতিমালা বদলায়নি। হয়তো নতুন স্লোগান এসেছে, কিন্তু পুরোনো মানসিকতা বহাল তবিয়তেই আছে। পুরোনো ঠেলার গাড়ি ঠেলতে যারা অভ্যস্ত, তারা নতুন চাকা লাগাতেও ভয় পায়; কারণ তাতে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আজ যে ডিজিটাল রূপান্তরের কথা বলা হচ্ছে। ওয়েবসাইট হবে, ডাটাবেজ হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও সক্রিয়তা বাড়বে। এসব অবশ্যই দরকার। কিন্তু মনে রাখতে হবে আধুনিক ওয়েবসাইট বানানো সহজ; আধুনিক সাংগঠনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা কঠিন। কারণ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক করে না; মানুষের চিন্তাই প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক করে। একটি নির্বাচিত কমিটি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু নির্বাচিত সদস্যদের ওপর নির্ভর করে চলে না। তারা বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগায়। আমাদের কমিউনিটির ভেতরেই অসংখ্য চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, আইটি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ পেশাজীবী রয়েছেন। তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কি আবাই কাজে লাগাতে পারছে?
ডাবলিন, কর্ক, গালওয়ে কিংবা লিমেরিকের মত বড় শহরগুলোতে নতুন অভিবাসীদের জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। কর্মসংস্থান, ভাষা শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা কিংবা ক্যারিয়ার উন্নয়ন নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে ফান্ডিংও পাওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব বড় চিন্তা বাস্তবায়নের জন্য নেতৃত্বের ভেতরে প্রয়োজনীয় মেধাগত সক্ষমতা এবং দূরদর্শিতা কতটুকু আছে?
ইদানিং আরেকটি বিষয়ের কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে বাতাসে। কেউ কেউ নাকি পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। তাহলে কি আবাইয়ের ভেতরে আরেকটি অদৃশ্য শক্তিকেন্দ্র তৈরি হয়েছে? এমন কোনো ছায়া-নেতৃত্ব, যারা আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও সিদ্ধান্তের লাগাম ধরে রেখেছেন? হতে পারে, এসব নিছক গুজব। আবার এটাও হতে পারে, ভদ্রলোকের হাসিমাখা মুখের আড়ালে এমন কিছু দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। যদি আবাইর ভেতর এমন কিছু থাকে, তাহলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্যদের । কারণ নেতৃত্ব কোনো অলংকার নয়; এটি জবাবদিহির আরেক নাম।
আরেকটি বিষয় কমিউনিটির মানুষকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়। সারা বছর আবাই নিয়ে কিছু মানুষের তেমন আগ্রহ দেখা না গেলেও, নির্বাচন এলেই তারা বর্বর ও ইতর আচরণে নেমে পড়েন। ব্যক্তিগত বিষয় পর্যন্ত টেনে এনে মানুষকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ধরনের যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অতীতে হুমকি-ধমকির ঘটনা থাকলেও, সর্বশেষ নির্বাচনে শারীরিক হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এই ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে, আগামী দিনে এ ধরনের নির্বাচন আদৌ কতটা যৌক্তিক—সেটি সবারই ভেবে দেখা প্রয়োজন।
বিদেশিদের নিয়ে আইরিশ সমাজে যখন ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হচ্ছে, তখন আমাদের নিজেদের জাতিগত আচরণের নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি যদি আরও প্রকট হয়ে ওঠে, তাহলে তা আইরিশদের বিরূপ মনোভাবকে আরও উসকে দিতে পারে। এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিকেই বহন করতে হবে । তাছারা এই ধরনের নির্বাচনী প্রক্রিয়া অনেক সময় খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে এবং কমিউনিটির ভেতরে অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ফাটল তৈরি করে। গলওয়ের ঘটনাই তার একটি উদাহরণ। কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ নির্বাচন কমিশনকে গলওয়ের পুরো ভোট বাতিল করতে হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল এবং তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভোট বাতিলের পর পুনরায় নির্বাচন না হওয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে, কিন্তু দিন শেষে গলওয়েবাসীকেই চড়া মূল্য দিতে হয়েছে কতিপয় ব্যক্তির অসদাচরণের কারণে। একটি শহরের মানুষের সামগ্রিক ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) সংগঠন গড়ে তোলার চিন্তা যেমন অবাস্তব ও বোকামির পরিচায়ক, তেমনি কিছু ব্যক্তি ক্ষমতার সুযোগ পেয়ে যে ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন, তা সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জন্যও চরম লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
পরিশেষে এটাই বলব, আমরা সবাই চাই আবাই সফল হোক। কারণ আবাইয়ের ব্যর্থতা কোনো ব্যক্তি বা কমিটির ব্যর্থতা নয়; এটি হবে পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির ব্যর্থতা। কিন্তু শুধু নতুন মুখ, নতুন ব্যানার কিংবা নতুন স্লোগান দিয়ে নতুন ইতিহাস লেখা যায় না,সেটি আবাইর নেতৃত্বকে বুঝতে হবে। তাদেরকে জানতে হবে, ইতিহাস লিখতে হলে নতুন চিন্তা লাগে। নতুন সংস্কৃতি লাগে। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করার সততা লাগে। তাই সময় এখন এই বাস্তবতা উপলব্ধি করার । ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে বড় করে দেখার। সময় এসেছে আনুগত্যের রাজনীতি থেকে মেধার রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার। সময় এসেছে করতালির চেয়ে আত্মসমালোচনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার।
অন্যথায় হয়তো আবাই থাকবে, কমিটি থাকবে, সংবর্ধনা থাকবে, ভোজনবিলাসের ছবি থাকবে, ফেসবুক পোস্ট থাকবে, বিবৃতি থাকবে—সবই থাকবে। শুধু ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে একটি জাতীয় সংগঠনের প্রাণ, বিশ্বাস এবং গ্রহণযোগ্যতা। আর তখন হয়তো আগামী প্রজন্ম, আমাদের চেয়েও কম ভদ্র ভাষায়, আমাদের কাছেই প্রশ্ন করবে—"এই আবাই নিয়া আমরা কি করিব?"