আয়ারল্যান্ডের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত প্রথম জনগণনা বা Census 1926 প্রকাশের পর দেশজুড়ে ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে কেন্দ্র করে ডাবলিন ক্যাসেলে একটি বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে ৩০০ এর বেশি প্রতিনিধি অংশ নেবেন। এই সম্মেলনকে আয়ারল্যান্ডের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক গবেষণার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৯২৬ সালের জনগণনা ছিল স্বাধীন আইরিশ ফ্রি স্টেট প্রতিষ্ঠার পর পরিচালিত প্রথম জাতীয় জনগণনা। ১৯১১ সালের পর এটি ছিল এমন একটি নথি যা নতুন রাষ্ট্রের সামাজিক অবস্থা, জনসংখ্যা, ভাষা, ধর্ম, পেশা এবং পারিবারিক কাঠামোর বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে। প্রায় একশ বছর আইনি সুরক্ষার আওতায় থাকার পর ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল এই নথিগুলো প্রথমবারের মতো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
জাতীয় আর্কাইভসের উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে জনগণনার ইতিহাস, সংরক্ষণ, ডিজিটাইজেশন, গবেষণা এবং আধুনিক আয়ারল্যান্ড বোঝার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থাকবেন ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ, বংশতালিকা গবেষক, আর্কাইভ বিশেষজ্ঞ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা।
সম্মেলনের আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসবে কীভাবে শতবর্ষ পুরোনো কাগজপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে, কীভাবে সেগুলো ডিজিটাল আকারে রূপান্তর করা হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণায় এই তথ্যভাণ্ডার কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
১৯২৬ সালের জনগণনা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার আগে আয়ারল্যান্ড সরকার প্রায় €৫ মিলিয়ন বিনিয়োগ করে একটি বৃহৎ সংরক্ষণ ও ডিজিটাইজেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি পরিবারভিত্তিক রেকর্ড সংরক্ষণ, স্ক্যান, ডিজিটাইজ এবং অনুসন্ধানযোগ্য ডাটাবেসে রূপান্তর করতে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে।
বর্তমানে এই তথ্যভাণ্ডার অনলাইনে বিনামূল্যে অনুসন্ধান করা সম্ভব, যা ইতিহাসবিদ ও পারিবারিক বংশতালিকা গবেষকদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘The Story of Us’ প্রদর্শনী
জনগণনা (Census) প্রকাশ উপলক্ষে ডাবলিন ক্যাসেলে ‘The Story of Us: Census 1926’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রদর্শনীও চালু করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে শতবর্ষ আগের আয়ারল্যান্ডের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, কাজকর্ম, খেলাধুলা এবং সামাজিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে সমসাময়িক ছবি, সরকারি নথি, অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা এবং জনগণনার আসল রেকর্ড ব্যবহার করে দর্শনার্থীদের সামনে ১৯২৬ সালের আয়ারল্যান্ডকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের প্রবাসীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
১৯২৬ সালের জনগণনা শুধু আয়ারল্যান্ডে বসবাসকারীদের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আইরিশ প্রবাসীদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশে বসবাসরত লাখো মানুষ এখন তাদের পূর্বপুরুষদের তথ্য খুঁজে বের করতে পারছেন। এই কারণেই জনগণনা প্রকাশকে আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস ও বৈশ্বিক প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি নতুন সংযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা
জাতীয় আর্কাইভস জানিয়েছে, জনগণনা প্রকাশকে কেন্দ্র করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ শিক্ষা উপকরণ, গবেষণা কর্মশালা, বক্তৃতা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য কেন আগ্রহের বিষয়?
আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেক সদস্যই এখন দেশটির ইতিহাস, সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। ১৯২৬ সালের জনগণনা নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আয়ারল্যান্ডের প্রথম দিককার সামাজিক বাস্তবতার একটি নির্ভরযোগ্য দলিল। ফলে যারা আয়ারল্যান্ডকে আরও গভীরভাবে জানতে চান, তাদের জন্য এই জনগণনা এবং তা নিয়ে আয়োজিত সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এক শতাব্দী আগে স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের মানুষ কেমন জীবনযাপন করতেন, কী ভাষায় কথা বলতেন, কোথায় কাজ করতেন এবং কীভাবে পরিবার গড়ে তুলেছিলেন, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ১৯২৬ সালের জনগণনায়। ডাবলিন ক্যাসেলের এই সম্মেলন সেই ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।সংবাদের সূত্রঃ
Department of Culture, Communications and Sport, National Archives of Ireland, Dublin Castle, Census 1926 Public Programme.