আয়ারল্যান্ডে অভিবাসন নিয়ে জনমত ও রাজনৈতিক বিতর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সামাজিক কল্যাণ ভাতা বা Welfare ব্যবস্থার ওপর অভিবাসীদের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন দাবি ও পাল্টা দাবির মধ্যে এবার নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে Economic and Social Research Institute (ESRI)। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ গবেষণায় বলা হয়েছে, অভিবাসীরা সামাজিক কল্যাণ ভাতা গ্রহণের ক্ষেত্রে আইরিশ জন্মগ্রহণকারী নাগরিকদের তুলনায় বেশি নির্ভরশীল এমন কোনো সাধারণ বা ধারাবাহিক প্রবণতা পাওয়া যায়নি।
Department of Justice, Home Affairs and Migration এর অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় Central Statistics Office (CSO) এর তথ্য ব্যবহার করে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ ভাতা গ্রহণের প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার লক্ষ্য ছিল অভিবাসীরা বাস্তবে কতটা সামাজিক সহায়তা গ্রহণ করেন এবং জনপরিসরে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সেই তথ্যের কতটা মিল রয়েছে তা যাচাই করা।
গবেষণার মূল ফলাফল কী বলছে
ESRI এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেকারত্ব ভাতা, অসুস্থতা ও প্রতিবন্ধকতাজনিত সহায়তা এবং পরিবার ও শিশু সম্পর্কিত বিভিন্ন ভাতা বিবেচনায় নিলে ২০২৪ সালে আইরিশ জন্মগ্রহণকারীদের ৫৬ শতাংশ অন্তত একটি ভাতা গ্রহণ করেছেন। একই সময়ে অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬১ শতাংশ। তবে গবেষকরা বলছেন, এই তুলনাটি সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ এর মধ্যে Child Benefit এর মতো সর্বজনীন সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারিবারিক কাঠামোও ভিন্ন।
যখন পৃথক ভাতার ধরন বিশ্লেষণ করা হয়, তখন দেখা যায় বেকারত্ব সম্পর্কিত ভাতা গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিবাসী ও আইরিশদের মধ্যে কার্যত কোনো পার্থক্য নেই। উভয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই এই হার প্রায় ৯ শতাংশ। অন্যদিকে প্রতিবন্ধকতা বা Disability সম্পর্কিত ভাতা গ্রহণের হার অভিবাসীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম।
একটি জটিল বাস্তবতা
গবেষণার প্রধান লেখকরা উল্লেখ করেছেন যে “অভিবাসীরা বেশি ভাতা নেন কি না” এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই। কারণ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত অভিবাসীদের মধ্যে বাস্তবতা ভিন্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ, আফ্রিকা, এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষের কর্মসংস্থান, পারিবারিক অবস্থা এবং আয়ের ধরনে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সামাজিক সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রেও একক কোনো চিত্র দেখা যায় না।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, কিছু অভিবাসী গোষ্ঠী শ্রমবাজারে বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এ ধরনের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন সহায়তা কার্যকর হতে পারে। তবে এসব সহায়তা অভিবাসীদের জন্য আলাদা নয়; বরং আইরিশ নাগরিক ও অভিবাসী উভয়ের জন্য বিদ্যমান সাধারণ সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার অংশ।
কর ও সরকারি অর্থনীতিতে অভিবাসীদের অবদান
একই দিনে প্রকাশিত ESRI এর আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে আয়ারল্যান্ডে বিদেশে জন্মগ্রহণকারী বাসিন্দারা গড় হিসাবে আইরিশ জন্মগ্রহণকারীদের তুলনায় বেশি আর্থিক অবদান রেখেছেন। গবেষণা অনুযায়ী, অভিবাসীরা সাধারণত অপেক্ষাকৃত কম বয়সী, কর্মসংস্থানে বেশি সক্রিয় এবং কর প্রদানকারী হওয়ায় তারা সরকারি ব্যয়ভার বহনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছেন।
বিশেষ করে অনেক non-EU অভিবাসীর মধ্যে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের হার তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় তাদের আর্থিক অবদানও উল্লেখযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশী ও অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্ব
আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য এই গবেষণা তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনা অনেক ক্ষেত্রে আবেগনির্ভর হয়ে উঠলেও ESRI এর এই গবেষণা তথ্যভিত্তিক একটি চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণাটি দেখায় যে সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবদানও আলোচনায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক আয়ারল্যান্ডের রাজনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ESRI এর সর্বশেষ গবেষণা মনে করিয়ে দেয় যে অভিবাসীদের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ধারণা বা গুজবের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও গবেষণালব্ধ প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সামাজিক কল্যাণ ভাতা গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিবাসীরা আইরিশদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নির্ভরশীল নন এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদানও রাখছেন।সংবাদের সূত্রঃ
আইরিশ নিউজ মিডিয়া এবং ESRI