আয়ারল্যান্ডজুড়ে আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এখন দেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ডাবলিনসহ বিভিন্ন শহরে বাড়িভাড়া, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চরম চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরে আয়ারল্যান্ডের গড় পরিবারগুলোর মাসিক খরচ প্রায় ১৬৫ ইউরো পর্যন্ত বেড়েছে। বার্ষিক হিসাবে যা প্রায় ২ হাজার ইউরোর কাছাকাছি। জ্বালানি, খাদ্য, বিমা এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিকে এই চাপের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে তারা আর্থিক চাপে রয়েছেন।
বিশেষ করে আবাসন খাতে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আয়ারল্যান্ডে ভাড়ার জন্য উন্মুক্ত বাড়ির সংখ্যা এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যম। ডাবলিনে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে বাড়িভাড়া লাগামহীনভাবে বাড়ছে এবং সাধারণ কর্মজীবী মানুষ উপযুক্ত বাসস্থান খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
আইরিশ টাইমস্ এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত পরিকল্পনার অভাব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসন সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প, কর ছাড় ও নতুন আবাসন নীতি ঘোষণা করা হলেও তার সুফল এখনো সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়নি।
এদিকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা আরও বাড়ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আয়ারল্যান্ডের প্রায় ৬২ শতাংশ তরুণ এখনো পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন, কারণ উচ্চ ভাড়া ও বাড়ির মূল্য তাদের স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ সীমিত করে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি পুরো প্রজন্মকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়েও দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বৈশ্বিক তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠায় আয়ারল্যান্ডে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন সেবার মূল্যও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ দেখা দিতে পারে।
বিরোধী দল Sinn Féin, Labour এবং Social Democrats সরকারকে ব্যর্থ উল্লেখ করে জরুরি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। তারা বিদ্যুৎ বিলের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা, জ্বালানিতে কর কমানো এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য নতুন ভর্তুকি চালুর আহ্বান জানিয়েছে।
সরকার অবশ্য দাবি করছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম চালু করেছে এবং আগামী বাজেটেও নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে সমালোচকদের মতে, বর্তমান সংকটের গভীরতার তুলনায় সরকারি পদক্ষেপ এখনো যথেষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি আয়ারল্যান্ডের সামাজিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে প্রবাসী কমিউনিটি, শিক্ষার্থী এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে।