আয়ারল্যান্ড

আয়ারল্যান্ডে ই-স্কুটার দুর্ঘটনায় শিশুদের মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি

· · ১২৮ বার পঠিত
আয়ারল্যান্ডে ই-স্কুটার দুর্ঘটনায় শিশুদের মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি

আয়ারল্যান্ডে ই-স্কুটার দুর্ঘটনায় গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশু ও কিশোরের সংখ্যা গত এক বছরে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। Children’s Health Ireland জানিয়েছে, ২০২৬ সালে Temple Street হাসপাতালে শিশুদের মোট traumatic brain injury ভর্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন ই-স্কুটার দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। আইন অনুযায়ী ১৬ বছরের কম বয়সীদের ই-স্কুটার চালানো নিষিদ্ধ হলেও হাসপাতালে আসা আহত শিশুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।

আয়ারল্যান্ডে ই-স্কুটার দুর্ঘটনায় শিশু ও কিশোরদের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। Children’s Health Ireland (CHI) জানিয়েছে, গত ১২ মাসে ই-স্কুটার দুর্ঘটনার কারণে traumatic brain injury বা আঘাতজনিত মস্তিষ্কের ক্ষতি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

CHI এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ডাবলিনের CHI at Temple Street এর Neurosurgery and Rehabilitation Services এ ভর্তি হওয়া শিশুদের মোট traumatic brain injury ঘটনার এক-তৃতীয়াংশের বেশি ই-স্কুটার দুর্ঘটনার কারণে ঘটেছে। শিশুদের মধ্যে মস্তিষ্কের গুরুতর আঘাত সৃষ্টির প্রধান কারণগুলোর তালিকায় ই-স্কুটার এখন শীর্ষে রয়েছে।

২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ই-স্কুটার-সম্পর্কিত আঘাত নিয়ে CHI এর জরুরি বিভাগগুলোতে মোট ১,১৩০ জন শিশু ও কিশোর চিকিৎসা নিতে এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দুজন শিশু ই-স্কুটার দুর্ঘটনায় আহত হয়ে CHI এর জরুরি বিভাগে আসছে।

শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, আহতদের শারীরিক অবস্থার জটিলতাও শিশুদের জরুরি চিকিৎসা বিভাগের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসক, নিউরোসার্জন, অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ, নিবিড় পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন দলের সহায়তা প্রয়োজন হচ্ছে।

২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ই-স্কুটার দুর্ঘটনায় traumatic brain injury নিয়ে ১২ জন শিশু CHI at Temple Street এর Neurosurgery team এর অধীনে ভর্তি হয়েছিল। পরবর্তী ১২ মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এ সংখ্যা ৫০ শতাংশ বেড়ে ১৮ জনে পৌঁছায়।

এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ২০২৬ সালের মে মাসের পর থেকে আরও অন্তত সাতজন শিশুকে একই ধরনের গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। CHI জানিয়েছে, ২০২৪ সালের মে মাসে ই-স্কুটার ব্যবহারের আইনি কাঠামো কার্যকর হওয়ার আগে এমন দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে আঘাত নিয়ে মাত্র একজন শিশু ভর্তি হয়েছিল। এরপর থেকে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪০ জনে পৌঁছেছে।

ই-স্কুটার দুর্ঘটনায় সব রোগীর আঘাত একই ধরনের নয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনেক শিশুর অবস্থা এতটাই গুরুতর থাকে যে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে Major Trauma Team সক্রিয় করতে হয়।

কিছু শিশুকে জরুরি অস্ত্রোপচার এবং intensive care দিতে হচ্ছে। গুরুতরভাবে আহতদের অনেককে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হয় এবং চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আচরণগত সক্ষমতা ফিরে পেতে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়।

Children’s Health Ireland এর Consultant Paediatrician in Neurodisability Dr Irwin Gill বলেছেন, ই-স্কুটার দুর্ঘটনার ক্ষতি মূল্যায়নের সময় কোনো শিশু বেঁচে আছে কি না, শুধু সেই বিবেচনার মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক শিশুকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থেকে অস্ত্রোপচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিতে হয়। কেউ কেউ জীবন পরিবর্তনকারী মস্তিষ্কের আঘাত নিয়ে বাড়ি ফেরে, যার কারণে স্থায়ী শারীরিক, সংবেদনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে।

আগের চিকিৎসা-তথ্যে দেখা গেছে, ই-স্কুটার-সম্পর্কিত মস্তিষ্কের আঘাতে ভর্তি শিশুদের একটি বড় অংশের চলাফেরায় নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেকের মধ্যে মনোযোগ ধরে রাখা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, স্মৃতিশক্তির সমস্যা এবং ব্যক্তিত্ব বা আচরণে পরিবর্তনের মতো জটিলতাও শনাক্ত হয়েছে।

১৬ বছরের কম বয়সীদের চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
আয়ারল্যান্ডে ২০২৪ সালের ২০ মে থেকে নির্দিষ্ট শর্তে জনসাধারণের সড়কে ই-স্কুটার চালানো বৈধ করা হয়। তবে আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, চালকের বয়স অবশ্যই কমপক্ষে ১৬ বছর হতে হবে।

বর্তমান আইনের অধীনে ই-স্কুটার ব্যবহারকারীদের জন্য প্রযোজ্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলো হলোঃ

  • চালকের বয়স কমপক্ষে ১৬ বছর হতে হবে
  • সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখতে হবে
  • ই-স্কুটারে কোনো যাত্রী বহন করা যাবে না
  • ফুটপাত বা মোটরওয়েতে ই-স্কুটার চালানো যাবে না
  • একটানা সর্বোচ্চ মোটরক্ষমতা ৪০০ ওয়াটের বেশি হতে পারবে না
  • সামনে ও পেছনে কার্যকর ব্রেক ও আলো থাকতে হবে
  • বেল বা সতর্কতামূলক শব্দ তৈরির ব্যবস্থা থাকতে হবে
  • মদ বা মাদক গ্রহণের পর ই-স্কুটার চালানো যাবে না

তা সত্ত্বেও ১৬ বছরের কম বয়সী বহু শিশু ই-স্কুটার চালাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ই-স্কুটারে একাধিক শিশু যাতায়াত করছে, যা আইনবিরোধী হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
স্বাস্থ্য ও সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বারবার অভিভাবকদের শিশুদের জন্য ই-স্কুটার না কেনার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-স্কুটারকে অনেক পরিবার এখনো খেলনা বা সাধারণ স্কুটারের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখে। বাস্তবে এগুলো উচ্চগতির মোটরচালিত যান এবং দুর্ঘটনার সময় চালকের শরীরের সুরক্ষার জন্য কোনো বহিরাবরণ থাকে না।

শিশুদের ঝুঁকি বোঝার সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপক্বতা এবং সড়কের পরিস্থিতি মূল্যায়নের দক্ষতা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় সীমিত। ফলে হঠাৎ ব্রেক করা, গর্ত এড়ানো, মোড় নেওয়া কিংবা যানবাহনের গতি অনুমান করার সময় তারা গুরুতর ভুল করতে পারে

আইন পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো হচ্ছে
শিশুদের গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত বাড়তে থাকায় ই-স্কুটার ব্যবহারের বর্তমান আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে। চিকিৎসকদের একটি অংশ শক্তিশালী আইন প্রয়োগ, বিক্রির ক্ষেত্রে বয়স যাচাই, অবৈধভাবে পরিবর্তিত ও অতিরিক্ত গতিসম্পন্ন ই-স্কুটারের বিরুদ্ধে অভিযান এবং অভিভাবকদের জবাবদিহির আওতায় আনার পক্ষে মত দিচ্ছেন।

সরকার ই-স্কুটারের বিপজ্জনক ও আইনবহির্ভূত ব্যবহার মোকাবিলায় নতুন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে কঠোর বিধিনিষেধ বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে। তবে চিকিৎসকদের মতে, শুধু আইন থাকা যথেষ্ট নয়। দোকান, অনলাইন বিক্রেতা, অভিভাবক, স্কুল এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া শিশুদের ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন হবে।

বাংলাদেশী পরিবারগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশী পরিবারগুলোর মধ্যেও কিশোর-কিশোরীদের যাতায়াতের জন্য ই-স্কুটার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কম খরচ, সহজ ব্যবহার এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা থাকলেও ১৬ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে এটি কোনোভাবেই বৈধ বা নিরাপদ পরিবহন নয়।

অভিভাবকদের মনে রাখা জরুরি যে, সন্তানকে ই-স্কুটার কিনে দেওয়া বা ব্যবহার করতে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফল শুধু জরিমানা বা Gardaí এর আইনগত ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি মুহূর্তের দুর্ঘটনা শিশুর শিক্ষা, চলাফেরা, স্মৃতিশক্তি, ব্যক্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

ই-স্কুটার শিশুদের খেলনা নয়, এটি একটি মোটরচালিত যান। হাসপাতালে প্রতিদিন আহত শিশুদের উপস্থিতি এবং গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত নিয়ে ভর্তির ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি প্রমাণ করছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার পর্যায়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তই শিশুদের জীবন পরিবর্তনকারী আঘাত থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সংবাদের সূত্রঃ
Children’s Health Ireland, Road Safety Authority, Government of Ireland, An Garda Síochána এবং আইরিশ নিউজ মিডিয়া।

Enter চাপুন বা বাটনে ক্লিক করুন  ·  ESC দিয়ে বন্ধ করুন

EN
বিশ্ব কমিউনিটি বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ড খেলাধূলা তথ্য প্রযুক্তি