২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল প্রেসিডেন্সির দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে আয়ারল্যান্ড। ছয় মাসব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামনে রেখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী Helen McEntee আয়ারল্যান্ডের মূল অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেছেন। ডাবলিনে European Movement Ireland আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্সি তিনটি প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, মূল্যবোধ এবং নিরাপত্তা।
Royal Irish Academy of Music এ অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, দূতাবাসের কর্মকর্তা এবং European Movement Ireland এর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগের দিন Government Buildings এ আয়ারল্যান্ডের EU Presidency Priorities and Policy Programme আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
আয়ারল্যান্ডের জন্য বড় কূটনৈতিক সুযোগ
Helen McEntee বলেন, EU কাউন্সিল প্রেসিডেন্সি আয়ারল্যান্ডের জন্য ইউরোপীয় আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তাঁর ভাষায়, এই প্রেসিডেন্সি হবে নাগরিকদের জন্য এমন একটি সময়, যখন আয়ারল্যান্ড ইউরোপের ভবিষ্যৎ নীতি, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
মন্ত্রী জানান, আয়ারল্যান্ড এমন একটি ইউরোপ গড়তে চায়, যা সুযোগ সৃষ্টি করবে, নাগরিকদের সুরক্ষা দেবে এবং নিজস্ব মৌলিক মূল্যবোধে অটল থাকবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবার ব্যবহার করা হবে সমঝোতা তৈরি, নীতি এগিয়ে নেওয়া এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গঠনের কাজে।
তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার
আয়ারল্যান্ডের আসন্ন EU প্রেসিডেন্সির মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে তিনটি অগ্রাধিকারের ওপর। এগুলো হলোঃ
- প্রতিযোগিতা সক্ষমতাঃ ইউরোপীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা, সিঙ্গেল মার্কেট গভীর করা, ব্যবসার জন্য সহজ নীতিগত পরিবেশ তৈরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেওয়া।
- মূল্যবোধঃ গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক আইন এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে ইউরোপীয় নীতির কেন্দ্রে রাখা।
- নিরাপত্তাঃ ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ঐক্য, সাইবার ও হাইব্রিড হুমকি মোকাবিলা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক সংকটে নীতিগত অবস্থান।
ইউক্রেন ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা থাকবে আলোচনার কেন্দ্রে
সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেন আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্সির একটি কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে ইউক্রেনকে রাজনৈতিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখবে এবং ইউক্রেনের EU সদস্যপদ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবে, তা এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে।
Helen McEntee আরও বলেছেন, ইউরোপ এখন এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন নিরাপত্তা পরিবেশের মুখোমুখি। রাশিয়ার আগ্রাসন, হাইব্রিড আক্রমণ, সাইবার ঝুঁকি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা ইউরোপীয় নীতিনির্ধারণে নতুন চাপ তৈরি করেছে। আয়ারল্যান্ড তার সামরিক নিরপেক্ষতার ঐতিহ্য বজায় রেখেও ইউরোপীয় নিরাপত্তা সহযোগিতায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায়।
দেশজুড়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
প্রেসিডেন্সির অংশ হিসেবে আয়ারল্যান্ড ২২টি অনানুষ্ঠানিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করবে। এর পাশাপাশি European Political Community এর একটি বৈঠক এবং European Council এর একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হবে। এসব বৈঠকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতা, মন্ত্রী, কমিশনার, কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেবেন।
ডাবলিন Castle প্রেসিডেন্সির প্রধান বৈঠকস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তবে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্সির সুফল যেন শুধু ডাবলিনে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য কর্ক, কেরি, লিমেরিক, মেয়ো এবং উইকলোতেও মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয় কমিউনিটি ও নাগরিক অংশগ্রহণ
সরকার বলছে, এই প্রেসিডেন্সি শুধু কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়; এটি নাগরিকদের ইউরোপীয় আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার একটি সুযোগ। County Pairings Programme, Communicating Europe Initiative এবং Presidency Cultural Programme এর মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন কাউন্টিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
European Movement Ireland এর Island of Ireland EU Poll ২০২৬ অনুযায়ী, আয়ারল্যান্ডের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ থেকে উপকৃত হয়েছে। সরকার এই জনসমর্থনকে নাগরিক সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
আয়ারল্যান্ডে বসবাসকারী বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য এই প্রেসিডেন্সি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি অভিবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ব্যবসা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, মানবাধিকার, ভিসা প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। আয়ারল্যান্ড যখন কাউন্সিল প্রেসিডেন্সি পরিচালনা করবে, তখন এসব বিষয়ে আলোচনার গতি ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে দেশটির ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হবে।
বিশেষ করে অভিবাসী পরিবার, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীদের জন্য ইউরোপীয় অর্থনীতি, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি নীতি এবং নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আয়ারল্যান্ডের EU প্রেসিডেন্সি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পালাক্রমিক দায়িত্ব নয়; এটি ইউরোপীয় নীতিনির্ধারণে আয়ারল্যান্ডের প্রভাব দেখানোর একটি বাস্তব পরীক্ষা। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে এই প্রেসিডেন্সি আয়ারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
আগামী ছয় মাসে নজর থাকবে আয়ারল্যান্ডের ওপর
২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও নীতিগত আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ইউরোপীয় মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো প্রেসিডেন্সির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সরকারের ভাষায়, এটি হবে “whole of Government” এবং “whole of country” প্রচেষ্টা। অর্থাৎ শুধু মন্ত্রী বা কর্মকর্তা নয়, আয়ারল্যান্ডের নাগরিক, কমিউনিটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি অঙ্গন এবং ব্যবসায়িক সমাজও এই প্রেসিডেন্সির অংশ হবে।
সংবাদের সূত্রঃGovernment of Ireland এবং Department of Foreign Affairs and Trade