প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে সম্পূর্ণ নতুন নকশার আইরিশ পাসপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেছে আয়ারল্যান্ড সরকার। শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী Helen McEntee নতুন পাসপোর্ট উদ্বোধন করে জানান, এটি শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়, বরং আয়ারল্যান্ডের পরিচয়, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক। একই সঙ্গে এতে যুক্ত করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা ভবিষ্যতের নিরাপদ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
আজ থেকেই নতুন পাসপোর্ট ইস্যু শুরু
সরকার জানিয়েছে, ২৬ জুন থেকে যারা নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করবেন, তারা নতুন নকশার এই পাসপোর্টই পাবেন। বিদ্যমান পাসপোর্টের বৈধতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করা যাবে। শুধুমাত্র নতুন আবেদন কিংবা নবায়নের ক্ষেত্রে নতুন সংস্করণ ইস্যু করা হবে।
নতুন নকশার পেছনে তিন বছরের প্রস্তুতি
নতুন পাসপোর্ট তৈরির কাজ প্রায় তিন বছর ধরে চলেছে। এই প্রকল্পে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, ডিজাইনার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কর্মকর্তারা যৌথভাবে কাজ করেছেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্য ছিল এমন একটি পাসপোর্ট তৈরি করা যা একই সঙ্গে নিরাপদ, আধুনিক এবং স্পষ্টভাবে আয়ারল্যান্ডের জাতীয় পরিচয় বহন করবে।
জনগণের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি নকশা
নতুন পাসপোর্টের নকশা তৈরির আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণে একটি জনপরামর্শ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা আইরিশ প্রকৃতি, দেশীয় প্রাণী, উদ্ভিদ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যেসব প্রতীক দেখতে চেয়েছিলেন, সেগুলোর ভিত্তিতেই নতুন শিল্পকর্ম নির্বাচন করা হয়েছে।
নতুন পাসপোর্টে যা যা স্থান পেয়েছে
পাসপোর্টের প্রতিটি পাতায় আয়ারল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঋতু পরিবর্তন, দেশীয় প্রাণী ও উদ্ভিদ, সামুদ্রিক পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আইরিশ উলফহাউন্ড (wolfhound), যা জনপরামর্শের মাধ্যমে অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল।
বিশ্বমানের নিরাপত্তা প্রযুক্তি
সরকারের মতে, নতুন আইরিশ পাসপোর্টে এমন কিছু নিরাপত্তা প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে যা বিশ্বের অন্য কোনো পাসপোর্টে আগে ব্যবহার করা হয়নি। এতে উন্নত বায়োমেট্রিক সুরক্ষা, সর্বাধুনিক হোলোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা সংযোজন করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
- উন্নত বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি
- নতুন প্রজন্মের হোলোগ্রাফিক সুরক্ষা
- জালিয়াতি প্রতিরোধে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা
- আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিচয় যাচাই প্রযুক্তি
- দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ব্যবহারের উপযোগী আধুনিক নকশা
মন্ত্রী McEntee'র বক্তব্য
পররাষ্ট্রমন্ত্রী Helen McEntee বলেন, আইরিশ পাসপোর্ট বিশ্বের অন্যতম বিশ্বস্ত ভ্রমণ নথি এবং এটি আইরিশ নাগরিকদের ১৮৬টি দেশে ভিসামুক্ত অথবা আগমনের পর ভিসা সুবিধাসহ ভ্রমণের সুযোগ দেয়। তাঁর ভাষায়, নতুন পাসপোর্ট আগামী বহু বছর আয়ারল্যান্ডকে পরিচয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশ্বসেরাদের কাতারে রাখবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন পাসপোর্টে বিশ্বের সর্বাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির সঙ্গে এমন একটি নকশা যুক্ত করা হয়েছে যা আয়ারল্যান্ডের ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং উদ্ভাবনী শক্তিকে একসঙ্গে তুলে ধরে।
২০২৫ সালে ইস্যু হয়েছিল ৯ লাখের বেশি পাসপোর্ট
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বজুড়ে আইরিশ নাগরিকদের জন্য ৯ লাখেরও বেশি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল। ফলে নতুন নকশার এই পাসপোর্ট আগামী বছরগুলোতে লাখো মানুষের হাতে পৌঁছাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আয়ারল্যান্ডের পরিচয় বহন করবে।
বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য এর গুরুত্ব
আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আইরিশ নাগরিক কিংবা ভবিষ্যতে আইরিশ নাগরিকত্ব অর্জনকারীদের জন্য নতুন পাসপোর্টই হবে সরকারি মানদণ্ড। নতুন নিরাপত্তা প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করবে, পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের জাতীয় পরিচয়কে আরও আধুনিকভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে।
নতুন আইরিশ পাসপোর্ট কেবল একটি প্রশাসনিক নথির পরিবর্তন নয়। এটি নিরাপত্তা প্রযুক্তি, জাতীয় পরিচয়, শিল্প, সংস্কৃতি এবং জনসম্পৃক্ততার সমন্বয়ে তৈরি একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতীক। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড তার প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্রে স্থান দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিচয়চিহ্ন তৈরি করেছে।সংবাদের সূত্রঃ
Government of Ireland, Department of Foreign Affairs and Trade এবং আইরিশ নিউজ মিডিয়া।