দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও জোরদার করতে নতুন ‘Roadmap for Social Inclusion 2026-2030’ চালু করেছে আয়ারল্যান্ড সরকার। ডাবলিনের Aviva Stadium এ অনুষ্ঠিত Social Inclusion Forum এ রোডম্যাপটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী Micheál Martin। সরকার বলছে, আগামী পাঁচ বছরে এই পরিকল্পনা হবে দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধির জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।
নতুন রোডম্যাপটি ‘whole-of-government’ বা সরকারব্যাপী সমন্বিত কৌশলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এর আওতায় বিভিন্ন সরকারি বিভাগ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, কমিউনিটি সংগঠন এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করবে, যাতে সমাজের প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করা যায়।
রোডম্যাপটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য: ২০৩০ সালের মধ্যে আয়ারল্যান্ডে ধারাবাহিক দারিদ্র্যের হার ২ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনা। একই সঙ্গে আয়ারল্যান্ডকে বিশ্বের অন্যতম সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী Micheál Martin তাঁর বক্তব্যে বলেন, দারিদ্র্য মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, সুযোগ সীমিত করে এবং সমাজের সংহতি দুর্বল করে। তাঁর মতে, যখন মানুষ পর্যাপ্ত আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তখন শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজই উপকৃত হয়।
সরকার ইতোমধ্যে দারিদ্র্য কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, তাঁর দপ্তরের অধীনে প্রতিষ্ঠিত Child Poverty and Well Being Programme Office বিভিন্ন সরকারি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করে শিশু কল্যাণ কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে শিশু দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশের নিচে নিয়ে আসা।
তিনি বলেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং পারিবারিক সহায়তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে।
রোডম্যাপে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে তাঁর দপ্তরে প্রতিষ্ঠিত নতুন Disability Unit প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, সেবা এবং সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সরকারি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
সরকারের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অতিরিক্ত আর্থিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তাই সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
গত কয়েক বছরে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে Hot School Meals কর্মসূচি সম্প্রসারণ, শিশুদের জন্য GP Visit Card চালু, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি, শিশু পরিচর্যা সুবিধা বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধী সেবা সম্প্রসারণ এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল বই সরবরাহ।
সরকারের দাবি, এসব উদ্যোগ ইতোমধ্যে হাজার হাজার পরিবার ও শিশুর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সহায়তা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী Micheál Martin তাঁর বক্তব্যে সামাজিক সুরক্ষাকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
তাঁর মতে, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।
Social Inclusion Forum কে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করছে। এখানে দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তি, কমিউনিটি সংগঠন, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকরা একত্রিত হয়ে মতামত বিনিময় করেন। সরকার বলছে, বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন করলে তা আরও কার্যকর হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ তাদের জীবনকে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করে দেখে না; তারা পরিবার, কমিউনিটি, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের অংশ হিসেবে জীবনযাপন করে। তাই দারিদ্র্য মোকাবিলায়ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
সরকার জানিয়েছে, রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা হবে। বিভিন্ন সরকারি বিভাগের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন এবং প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
এর ফলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি পরিমাপ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিগত পরিবর্তন আনা সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার।
বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য এর তাৎপর্য
আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশী পরিবার, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং নতুন অভিবাসীদের জন্যও এই রোডম্যাপ গুরুত্বপূর্ণ। আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু কল্যাণ, সামাজিক সুরক্ষা এবং কমিউনিটি সহায়তা ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে এর সুফল প্রবাসী বাংলাদেশীরাও পাবেন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার, শিশু এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সরকারি সহায়তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
Roadmap for Social Inclusion 2026–2030 শুধুমাত্র একটি সরকারি নীতিমালা নয়; এটি আগামী পাঁচ বছরে আয়ারল্যান্ডের সামাজিক উন্নয়নের একটি বিস্তৃত রূপরেখা। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশু কল্যাণ, প্রতিবন্ধী অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সমন্বিত অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে আরও ন্যায়সঙ্গত, সমতাভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।সংবাদের সূত্রঃ
Department of the Taoiseach