আয়ারল্যান্ডের সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির গতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশটির স্বাধীন আর্থিক পর্যবেক্ষক সংস্থা Irish Fiscal Advisory Council (IFAC)। সংস্থাটি বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহুজাতিক প্রযুক্তি ও ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ কর্পোরেট কর আদায়ের ফলে সরকারের রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এই অতিরিক্ত আয়ের বড় অংশ চলমান সরকারি ব্যয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক মূল্যায়নে IFAC জানিয়েছে, আগামী কয়েক বছরে আয়ারল্যান্ডের সরকারি ব্যয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অল্পসংখ্যক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর প্রদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
IFAC এর মতে, কর্পোরেট কর থেকে আসা অতিরিক্ত অর্থের খুব সামান্য অংশ ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দশকের শেষ পর্যন্ত কর্পোরেট কর থেকে আদায় হওয়া প্রতি ৬ ইউরোর মধ্যে মাত্র ১ ইউরো সঞ্চয় করা হবে, আর বাকি ৫ ইউরো বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি ও চলমান ব্যয়ে ব্যবহৃত হবে।
IFAC চেয়ারম্যান সিমাস কফি বলেছেন, বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে সরকার ক্রমশ এমন একটি আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা স্বভাবতই অস্থির এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দ্রুত কমে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত সরকারি ব্যয় গড়ে বছরে ৭ শতাংশেরও বেশি হারে বাড়তে পারে। অথচ অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৫ শতাংশ বলে বিবেচিত হয়।
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অন্যান্য সরকারি খাতে ধারাবাহিক বাজেট অতিক্রম করে ব্যয় করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত কয়েকটি বাজেটে পরিকল্পিত ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ হয়েছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
আয়ারল্যান্ডের কর্পোরেট কর আয়ের বড় অংশ আসে অল্পসংখ্যক মার্কিন প্রযুক্তি ও ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে। গত এক দশকে এই কর রাজস্ব কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে এটি সরকারি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে আন্তর্জাতিক করনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত কর্মসংস্থান পরিবর্তন বা বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসায়িক কৌশলের পরিবর্তনের কারণে এই আয় ভবিষ্যতে কমে যেতে পারে।
সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য Future Ireland Fund এবং Infrastructure, Climate and Nature Fund এর মতো সঞ্চয় তহবিল গঠন করেছে। কিন্তু IFAC এর মতে, বর্তমান আর্থিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব তহবিলে অর্থ জমা দিতে সরকারকে ভবিষ্যতে ঋণ নিতে হতে পারে, কারণ পরিকল্পিত উদ্বৃত্ত সেই পরিমাণ অর্থ জোগান দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জনসেবায় বিনিয়োগের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয় তহবিলেও অর্থ সংরক্ষণের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখার কথা বলছে।
তবে IFAC মনে করছে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক মন্দা বা অপ্রত্যাশিত সংকট মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য এর তাৎপর্য
আয়ারল্যান্ডে বসবাসকারী বাংলাদেশীসহ অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি ব্যয়নীতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, আবাসন এবং অবকাঠামো খাতে সরকারের বিনিয়োগ সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান, করনীতি এবং সরকারি সেবার মান নিশ্চিত করার জন্যও অপরিহার্য।
IFAC এর সর্বশেষ সতর্কবার্তা মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ঝুঁকির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, অল্পসংখ্যক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর প্রদানের ওপর অতিনির্ভরতা এবং দ্রুত ব্যয় বৃদ্ধি ভবিষ্যতে সরকারি অর্থব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান উদ্বৃত্তের একটি বড় অংশ সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় দেশটি আরও প্রস্তুত থাকবে।সংবাদের সূত্রঃ
Irish Fiscal Advisory Council (IFAC) এবং আইরিশ মিডিয়া।