আয়ারল্যান্ডের রেলব্যবস্থাকে আধুনিক ও আরও দক্ষ করে তুলতে কয়েক বছর আগে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রযুক্তি প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটিই এখন বড় ধরনের বিতর্ক ও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আইরিশ রেলের Traffic Management System (TMS) প্রকল্প, যার মাধ্যমে দেশের রেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সিগন্যালিং ব্যবস্থাপনা এবং যাত্রীসেবাকে আধুনিক করার পরিকল্পনা ছিল, বর্তমানে ব্যয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
কী ছিল প্রকল্পটির উদ্দেশ্য
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল আয়ারল্যান্ডের পুরোনো ও বিচ্ছিন্ন সিগন্যালিং ব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা। নতুন National Train Control Centre এর মাধ্যমে সারা দেশের ট্রেন চলাচল পর্যবেক্ষণ, সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ এবং অপারেশনাল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
২০২০ সালে স্পেনভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Indra এর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয়। শুরুতে সফটওয়্যার উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রায় €৩২ মিলিয়নের চুক্তি হলেও পরবর্তীতে পুরো প্রকল্পের ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।
ব্যয় €২০০ মিলিয়ন অতিক্রম করেছে
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির সামগ্রিক ব্যয় প্রায় €১৭০ মিলিয়ন ধরা হলেও বিভিন্ন বিলম্ব, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বাস্তবায়ন জটিলতার কারণে সেই ব্যয় ইতোমধ্যে €২০০ মিলিয়নের সীমা অতিক্রম করেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত কত ব্যয় হবে বা কবে সম্পূর্ণ হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারছে না আইরিশ রেল।
সম্প্রতি আইরিশ রেল তাদের আর্থিক হিসাব থেকে প্রকল্পটির মূল্য €৫০ মিলিয়ন কমিয়ে দেখিয়েছে, যা কার্যত প্রকল্পের বর্তমান অবস্থার ওপর আস্থাহীনতার একটি বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক পর্যালোচনা ও পরীক্ষায় সফটওয়্যার সংক্রান্ত নানা ত্রুটি এবং বাস্তবায়ন সমস্যার বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপ চালুর জন্য নির্ধারিত সময়সীমা একাধিকবার পিছিয়ে গেছে এবং পরীক্ষামূলক কার্যক্রমেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়ারল্যান্ডের বিদ্যমান সিগন্যালিং অবকাঠামোর একটি বড় অংশ কয়েক দশক পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। সেই পুরোনো অবকাঠামোর সঙ্গে নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমন্বয় করাই প্রকল্পটির অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
National Transport Authority সতর্ক করেছে যে নতুন ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সময়মতো চালু না হলে কর্ক অঞ্চলের নতুন সিগন্যালিং প্রকল্পেও বিলম্ব দেখা দিতে পারে। এতে প্রতি মাসে অতিরিক্ত কয়েক লাখ ইউরো পর্যন্ত ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
একই সঙ্গে ডাবলিন এ বিদ্যমান সিগন্যালিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দেরও প্রয়োজন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি নিয়ে ইতোমধ্যে Oireachtas তে বিভিন্ন কমিটি প্রশ্ন তুলেছে। বিরোধী দলের একাধিক রাজনীতিক এটিকে করদাতাদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, প্রকল্পটির পরিকল্পনা, তদারকি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কোথায় ভুল হয়েছে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
এদিকে National Transport Authority একটি স্বাধীন পর্যালোচনা কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন ভবিষ্যতের বড় রেল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Dart+ সহ অন্যান্য পরিকল্পিত রেল সম্প্রসারণ উদ্যোগ অনেকাংশে আধুনিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
ফলে TMS প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতা বা আরও বিলম্ব শুধু বর্তমান রেলসেবাকেই নয়, আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ গণপরিবহন উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
আইরিশ রেলের Traffic Management System প্রকল্পটি আয়ারল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত প্রযুক্তি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে এটি ব্যয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং প্রশাসনিক প্রশ্নবিদ্ধতার কারণে কঠিন পরীক্ষার মুখে রয়েছে। স্বাধীন তদন্ত ও পর্যালোচনার ফলাফল এখন নির্ধারণ করবে প্রকল্পটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে, নাকি এটি আয়ারল্যান্ডের সরকারি প্রযুক্তি প্রকল্পগুলোর আরেকটি ব্যয়বহুল ব্যর্থতার উদাহরণ হয়ে থাকবে।সংবাদের সূত্রঃ
আইরিশ নিউজ মিডিয়া, National Transport Authority, Oireachtas Records, Irish Rail, Indra Technologies.