পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে আয়ারল্যান্ড সরকার। বিচার, স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রী জিম ও’ক্যালাহান মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য এমন একটি বিল উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে বর্তমান বা সাবেক সঙ্গীর বিরুদ্ধে গুরুতর পারিবারিক সহিংসতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ্যে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
প্রস্তাবিত আইনটি ‘জেনিস ল’ নামে পরিচিত। ২০২১ সালে ডাবলিনের ফিংলাস এলাকায় নিহত জেনিফার পুলের স্মরণে এই আইনের নামকরণ করা হয়েছে। তদন্তে উঠে আসে যে তিনি তার সঙ্গীর পূর্ববর্তী সহিংস আচরণ ও অপরাধের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তার মৃত্যুর পর থেকে পরিবার এবং বিভিন্ন অধিকারকর্মী সংগঠন এমন একটি আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছিল।
নতুন আইনে কী থাকছে
প্রস্তাবিত আইনের অধীনে গুরুতর পারিবারিক সহিংসতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের তথ্য একটি প্রকাশ্য নিবন্ধনে সংরক্ষণ করা হবে। এই নিবন্ধন Courts Service পরিচালনা করবে এবং সাধারণ জনগণ নির্দিষ্ট তথ্য দেখতে পারবেন।
তবে প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক হবে না। সংশ্লিষ্ট বিচারক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন তথ্য প্রকাশ জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় কি না। পাশাপাশি ভুক্তভোগী বা বেঁচে যাওয়া ব্যক্তির সম্মতিকেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হবে।
যেসব অপরাধ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে
সরকারি প্রস্তাব অনুযায়ী নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত অপরাধগুলোর মধ্যে থাকতে পারেঃ
- হত্যা ও নরহত্যা
- ধর্ষণ ও গুরুতর যৌন সহিংসতা
- গুরুতর শারীরিক হামলা
- শ্বাসরোধ বা শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা
- হত্যার হুমকি
- হয়রানি ও অনুসরণমূলক আচরণ (Stalking)
- জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ (Coercive Control)
- ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও প্রকাশের হুমকি
সরকার কেন এই পদক্ষেপ নিচ্ছে
সরকারের মতে, আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া গুরুতর অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য ইতোমধ্যে একটি প্রকাশ্য বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই তথ্য সহজে নাগরিকদের নাগালে আনা জননিরাপত্তার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মন্ত্রী জিম ও’ক্যালাহান বলেছেন, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কাউকে অতিরিক্ত শাস্তি দেওয়া নয়; বরং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি নতুন সম্পর্কে জড়াচ্ছেন, তারা সম্ভাব্য সঙ্গীর সহিংসতার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন।
ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিষয়টি
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার জানিয়েছে, নিবন্ধনে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হবে না যাতে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ পায় বা তার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। একই সঙ্গে সহায়তা সেবা, জরুরি যোগাযোগ এবং পরামর্শ কেন্দ্রগুলোর তথ্যও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আয়ারল্যান্ডে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গার্দার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে হাজারেরও বেশি অভিযোগ নথিভুক্ত হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে ‘Zero Tolerance Strategy’ এর আওতায় পারিবারিক, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।
‘জেনিস ল’ সেই বৃহত্তর কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার লক্ষ্য সহিংসতা প্রতিরোধ, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য গুরুত্ব
আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশীসহ অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য এই আইনটি তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। নতুন সম্পর্কে জড়ানোর আগে সম্ভাব্য সঙ্গীর সহিংসতার ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি এটি পারিবারিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা পাওয়ার পথ সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি করবে।
‘জেনিস ল’ কেবল একটি নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থা নয়; এটি আয়ারল্যান্ডে পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনি জবাবদিহিতা জোরদারের একটি প্রচেষ্টা। আইনটি কার্যকর হলে জননিরাপত্তা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার মধ্যে একটি নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যাবে।সংবাদের সূত্রঃ
আইরিশ নিউজ মিডিয়া, Department of Justice, Home Affairs and Migration, Oireachtas, Courts Service Ireland