সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডস্থ “সাহিত্যসভা”র উদ্যোগে কাউন্টি কিলকেনিতে এক সফল সাহিত্য আড্ডা হয়ে গেলো। রীতিধারা অনুযায়ী এবারের অনুষ্ঠানটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন আমাদের সবার পরিচিত কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ড. আরমান রহমান তাঁর স্বভাবসুলভ স্বচ্ছন্দ রূপায়ন ও বলিষ্ঠ সঞ্চালনার মাধ্যমে ছন্দপতনহীন ভাবে পঞ্চম বারের মতো অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানটির সফল কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।
প্রতিবারই এ সভায় কোনো না কোনো কবি-সাহিত্যিকের উপর আলোকপাত করা হয়ে থাকে। এবারের আলোচনায় উঠে আসেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর জীবনী, কাব্য ও সাহিত্য কর্মের উপর আলোচনা এবং আবৃত্তিতে অংশ নেন পদার্থ বিদ্যার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী এবং বিশিষ্ট কবি ড. জাকিয়া রহমান, বিশিষ্ট কবি ও লেখক ড. জিন্নুরাইন জায়গীরদার, কবি ও বিজ্ঞানী ড. শ্যামল হোসেন, ড. রহমান, ড. লুবনা হোসেন, ড. আরমান রহমান, মিসেস রহমান, সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান, কাউন্সিলর আজাদ তালুকদার, সাংবাদিক ও কবি সৈয়দ জুয়েল এবং সজল মিত্র, সাংবাদিক মাহিদুল ইসলাম সবুজ, কবি আব্দুল মালেক, কবি ও একাউন্টেন্ট ওমর ফারুক নিউটন, সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তিত্ব কবির আহম্মেদ, এনামুল হক, বিপ্লব দাস, মমতাজ কবির কলি, সৈয়দ মিল্টন, মুজিবুর রহমান, কবি ও প্রাবন্ধিক সাজেদুল চৌধুরী রুবেলসহ অনেকেই।
আলোচকগণ কবির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি তার সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা করার জন্য দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে “জীবনানন্দ গবেষণাগার” স্থাপনের দাবি জানান। শুধু তাই নয়, মরনোত্তর বিভিন্ন জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। কবিতা ও গদ্যপাঠ, আবৃত্তি ও সংগীতের বাইরে গিয়ে কেবলমাত্র একজন কবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠার মাধ্যমে সভাটি যেভাবে সরগরম হয়ে ওঠলো তাতে মনে হলো এ যেনো সাহিত্যচরিত্রের চির মন্থনের বিপরীতে ফেঁপে ওঠা এক গভীর স্রোত, যা আমাকে খুবই উচ্ছ্বসিত করে।
প্রবাস জীবনের দোলাচলে শরৎ-বসন্তের যে প্রতিধ্বনি আঁকার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলাম সেই স্পৃহা মিটিয়ে দৃঢ়পণে সামনের দিকে তা এগিয়ে চলছে বলেই আমার মনে হলো।
দেশে থাকতে প্রায়ই ছড়া বা কবিতা পাঠের আসরে যোগ দেয়া হতো। আমার এখনো মনে পড়ে সিলেটের প্রখ্যাত ছড়াকার সুফিয়ান আহমদ চৌধুরীর “চাঁদের হাট” নামে ছড়া পাঠের আসরে কিংবা নব্বই দশকের অন্যতম কবি ও প্রাবন্ধিক আমার বড়ো ভাই দিলোয়ার ইবনে ইউনুসের সাথে কবি শাহাদাত বুলবুলের পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে, ফাহিম ফিরোজের ইনকিলাব ভবনে ও কবি ও সাংবাদিক আমিনুল আহসানের দৈনিক সমাচারে যে কবিতা পাঠের আসর জমতো সেখানে প্রায়ই যোগদান করতাম। বিদেশ বিভুইয়ে আসার পর দেশের সেই স্মৃতিগুলো প্রায়ই মনে পড়তো। হৃদয়ে দাগ কাটতো। দীর্ঘ সময় স্থায়ী ভাবে প্রবাসে বসবাসের পরও রক্তের সাথে মিশে থাকা এসব স্মৃতি ভুলতে পারতামনা।
তাই ২০১৪/২০১৫ সাল থেকেই মনে মনে আয়ারল্যান্ডে একটি “সাহিত্য পরিষদ” গঠনের চিন্তাভাবনা করছিলাম। কিন্তু “মনের জোর” বলতে যা বোঝায় তার কিছুটা অভাব ছিলো। ফলে সামনে এগোতে পারছিলাম না। এরিমধ্যে সম্ভবত ২০১৯ সালে আমাদের এক প্রিয় ভাই রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। তার জানাজার নামাজে যোগদানের জন্য স্লাইগো যাই। সেখানে দেখা হয় সাহিত্যানুরাগী অনুজ রহমান রুহেলের সাথে। তার সাহিত্যপ্রীতি আমাকে তার প্রতি বেশ উৎফুল্ল ও স্নেহকাতর করে তোলে। তাই আমি তাকে আমার সাহিত্য বিষয়ক পরিকল্পনাটার কথা জানাই। আয়ারল্যান্ডে সে-ই প্রথম ব্যক্তি যার কাছে আমি বিষয়টি শেয়ার করি।
সে আমার কথা শুনে উৎফুল্ল চিত্তে এ মহতী উদ্যোগকটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের আহ্বান জানালো। কিন্তু কে কার কথা মনে রাখে! স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যর কারণে বাড়ি ফিরেই আমি সব ভুলে যাই।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয়ারল্যান্ডে যখন সর্বপ্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় তখন মেলার অন্যতম প্রধান আয়োজক, কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মোস্তফিজুর রহমানের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে তিনিও একইভাবে আমাকে বেশ দরদ দিয়ে উৎসাহ প্রদান করেন। কিন্তু কভিডের কারণে পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়লে আর এগোতে পারিনি।
পরবর্তীতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ফিরে পাবার পর মানুষ যখন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠলো আমিও সাহিত্য পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে একটু নড়েচড়ে বসলাম। কথা বললাম আবারও সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের সাথে। এবারও তিনি অনুপ্রেরণা জোগালেন এবং একজন অগ্রজ ব্যক্তি হিসেবে কিছু দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ প্রদান করলেন যা আমি সাদরে গ্রহণ করি। পরিশেষে তার সাথে কথা বলার আরও প্রায় ছয় মাস পর অপেক্ষার চিহ্ন মুছে দিয়ে সাহিত্য আড্ডার সেই সচকিত প্রতিচ্ছবিটি আঁকতে সক্ষম হই।
১১ নভেম্বর ২০২৩। দুপুর একটা থেকে দুটোর মধ্যে অধিকাংশ আমন্ত্রিত অতিথি গন্তব্যে পৌঁছে যান। আমার মতো নগণ্য মানুষের ডাকে এমন গুণী মানুষের সাড়া, সত্যিই আমাকে অভিভূত করে। তাই আমি লিমরিক স্টুডেন্ট ক্যাম্পাসে তাদেরকে কৃতজ্ঞতা, অভিবাদন ও ফুলেল শুভেচ্ছা জানাই। মধ্যাহ্নভোজনের সাদামাটা আয়োজন ছিলো। তাদেরকে তা পরিবেশন করি। খাবার-দাবার শেষে অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমরা সবাই আড্ডায় বসি।
আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, প্রিয় আরমান ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যেহেতু রুবেল ভাই আমাদেরকে ডেকেছেন সেহেতু তার মাথায় কিছু না কিছু আছে! তাই আমরা তার কথা আগে শুনি।” ফলে আবারও আমি সবাইকে সাধুবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য তুলে ধরি। আয়ারল্যান্ডে একটি সাহিত্য পরিষদ বা সাহিত্য সংস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করি। এর গঠন প্রনালী, রূপরেখা ও সামনে পরিচালিত হওয়ার বিবরণী দিই।
আমি এও বলি, এটি কোনো গতানুগতিক “সভাপতি” ও “সাধারণ সম্পাদক” মার্কা সংগঠন হবেনা। এখানে সবাই সদস্য, আবার সবাই সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক। উপস্থিত সকলই আমার সাথে সহমত প্রকাশ করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে সাহিত্য পরিষদের পরিবর্তে “সাহিত্যসভা” নামটি বেছে নেয়া হয়।
নামকরণের কিছুক্ষণ পরেই উপস্থিত হন আবাই’র (ABAI) বর্তমান সভাপতি মোহাম্মাদ মোস্তফা ও বিসিডির (BCD) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ শাহাদাত হোসেন। তারা এ মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং বলেন, “অন্য আরেকটি অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শেষ না করেই এখানে আসতে হয়েছে! রুবেল ভাই ডেকেছেন, না এসে কি পারি!”
আবাই’র তৎকালীন সভাপতি ডা. জিন্নুরাইন জায়গীরদার ব্যক্তিগত কারণে উপস্থিত হতে পারেননি তবে তিনি টেলিফোনে এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন ও আমাকে সাধুবাদ জানান এবং একে এগিয়ে নিতে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
আয়ারল্যান্ডে “সাহিত্যসভা” সৃষ্টির রূপকল্পের গল্পটি মূলত এরকমই। একদিন এ “সভা” হয়তোবা “মহাসভায়” রূপান্তরিত হবে। তখন যেনো তা অসত্য তথ্য দ্বারা আক্রান্ত না হয় কিংবা তথ্যবিকৃতি বা তথ্যবিভ্রাটে না ভোগে সে চিন্তা-ভাবনা থেকেই আজকের এ লেখা। আমি বিশ্বাস করি, আয়ারল্যান্ডে সাহিত্যসভার সত্য ইতিহাস দাঁড় করানোর নিমিত্তে এ লেখাটি একসময় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
লিমরিক
২৪ মে ২০২৬