রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপে নিরাপত্তা উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক একাধিক ড্রোন ঘটনা, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সামরিক সতর্কতা এবং NATO সদস্যদেশগুলোর ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণে ইউরোপজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রোমানিয়ার Galați শহরে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা। রোমানিয়ান কর্তৃপক্ষের দাবি, ইউক্রেনে পরিচালিত রুশ হামলার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত একটি ড্রোন দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। এতে অন্তত দুইজন আহত হন। ঘটনাটি NATO সদস্য কোনো দেশের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ড্রোন আঘাতের অন্যতম গুরুতর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঘটনার পর NATO মহাসচিব Mark Rutte রোমানিয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন, জোটের প্রতিটি সদস্যদেশের ভূখণ্ড রক্ষায় NATO প্রস্তুত রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়ার “বেপরোয়া আচরণ” ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করছে।
রোমানিয়াও ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে NATO এর কাছ থেকে অতিরিক্ত সহায়তা চেয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin দাবি করেছেন, ড্রোনটির উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগে রাশিয়াকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ড্রোনটি ইউক্রেনেরও হতে পারে এবং এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান Dmitry Medvedev ইউরোপকে ভবিষ্যতে আরও ড্রোন-সংক্রান্ত ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ইউরোপীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শুধু রোমানিয়াই নয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং ফিনল্যান্ডের আকাশসীমাতেও একাধিক ড্রোন প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার কিছু ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় ড্রোন পথ হারিয়ে NATO অঞ্চলে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ার ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়েছে।
ফলে NATO এর পূর্ব সীমান্তজুড়ে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার নজরদারি এবং ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারের দাবি বাড়ছে।
ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উদ্বেগ এখন শুধু সরাসরি সামরিক হামলা নয়; বরং তথাকথিত “Hybrid Threat” বা বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে ড্রোন অনুপ্রবেশ, সাইবার হামলা, GPS জ্যামিং, অবকাঠামো নাশকতা এবং কৌশলগত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা।
বিভিন্ন ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থা গত কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে সন্দেহভাজন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে।
রোমানিয়ার ঘটনার পর ফ্রান্স রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারাও ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই তার প্রভাব ইউরোপের ভেতরে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
যদিও আয়ারল্যান্ড NATO সদস্য নয়, তবুও ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দেশটির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আয়ারল্যান্ড সাইবার নিরাপত্তা, সমুদ্রতল কেবল সুরক্ষা এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আরও সক্রিয় আলোচনা শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে নিরাপত্তা উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তা জ্বালানি বাজার, অর্থনীতি, অভিবাসন এবং সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যেও সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, NATO এর ভূমিকা এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে।
রোমানিয়ার ড্রোন ঘটনা ইউরোপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। NATO সদস্যদেশগুলোর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপরও সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।সংবাদের সূত্রঃ
Reuters, NATO, Associated Press, Euronews, The Guardian, Al Jazeera এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সূত্রে প্রকাশিত তথ্য।