কমিউনিটি

কমিউনিটিতে জ্ঞানের দুর্দিনঃ ‘Passport Surgery’ না ‘কনস্যুলার সেবা’ - পরিভাষার বিতর্ক ও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব

· · ১৮৩ বার পঠিত
কমিউনিটিতে জ্ঞানের দুর্দিনঃ ‘Passport Surgery’ না ‘কনস্যুলার সেবা’ - পরিভাষার বিতর্ক ও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব

আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ‘Passport Surgery’ শব্দবন্ধের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বিতর্ক ভাষা, সরকারি পরিভাষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই বিশ্লেষণধর্মী মতামত নিবন্ধে লেখক যুক্তি দিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষা ‘কনস্যুলার সেবা’ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বিভ্রান্তিকর বিকল্প শব্দ ব্যবহারের যৌক্তিকতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ক, আত্মসমালোচনা এবং ভাষাগত শুদ্ধতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

দার্শনিক কার্ল পপার (Karl Popper) বলেছিলেন,

“True ignorance is not the absence of knowledge, but the refusal to acquire it.”

অর্থাৎ, “প্রকৃত অজ্ঞতা জ্ঞানের অভাব নয়; বরং জ্ঞান অর্জন করতে অস্বীকার করাই প্রকৃত অজ্ঞতা।”

এই উক্তিটি কেবল দর্শনের একটি বক্তব্য নয়; এটি একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্র মূল্যায়নেরও গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। কারণ একটি সুস্থ সমাজের পরিচয় প্রশ্নহীন ঐকমত্যে নয়; বরং যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ক, আত্মসমালোচনা এবং সত্য অনুসন্ধানের সংস্কৃতিতে প্রকাশ পায়।

আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষা, পেশাগত সাফল্য, উদ্যোক্তা সৃষ্টির সক্ষমতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই কমিউনিটি একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করেছে। বিশ্বের বহু শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ইউরোপীয় সদর দপ্তর আয়ারল্যান্ডে অবস্থিত। জ্ঞানভিত্তিক এই সমাজে বসবাসকারী একটি প্রবাসী কমিউনিটির কাছ থেকেও মানুষ ভাষাগত সচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং যুক্তিবাদী সংস্কৃতি প্রত্যাশা করে।

সম্প্রতি আপাতদৃষ্টিতে একটি ছোট ঘটনা আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

আগামী ২৫ জুলাই বাংলাদেশ হাইকমিশন, লন্ডন আয়ারল্যান্ডের কারলো শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য কনস্যুলার সেবা প্রদান করবে। আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক মিশন না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ হাইকমিশন, লন্ডন এখানকার বাংলাদেশি নাগরিকদের ই-পাসপোর্ট, এনভিআর (NVR), জন্মনিবন্ধন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, বিভিন্ন ধরনের অ্যাটেস্টেশনসহ নানা কনস্যুলার সেবা প্রদান করে আসছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগী সংগঠন হিসেবে কাজ করছে অল বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড (ABAI)। নিঃসন্দেহে কমিউনিটির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

কিন্তু প্রায় প্রতিবারই যখন বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়ারল্যান্ডে এই সেবা দিতে আসে, তখন একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

এই কার্যক্রম উপলক্ষে ABAI যে প্রচারণামূলক পোস্টার প্রকাশ করেছে, সেখানে “কনস্যুলার সেবা (Consular Services)”-এর পরিবর্তে “Passport Surgery” শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে। আর এখান থেকেই বিতর্কের সূচনা।

“Passport Surgery” শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে এর আগেও বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। জানতে চাওয়া হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত “কনস্যুলার সেবা” পরিভাষার পরিবর্তে “Passport Surgery”-এর মতো একটি বিভ্রান্তিকর শব্দ ব্যবহারের কারণ কী? কেন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষাকে বাদ দিয়ে এমন একটি শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কার্যক্রমের প্রকৃত অর্থ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে না? কিন্তু কোনোবারই এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।

তবে এবার এই বিষয়ে আমার একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে কয়েকজনের মন্তব্য বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

বিশেষ করে ABAI-এর সাধারণ সম্পাদকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় প্রস্তুত দীর্ঘ লেখাটি আমাকে হতাশ করেছে। কেউ একজন লেখাটি আমাকে ফরওয়ার্ড করলে প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো এবার আমার প্রশ্নের একটি সুসংগত ও সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু পরে বুঝলাম, যেহেতু লেখাটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি, তাই সেখানে আমার মৌলিক প্রশ্নের সরাসরি উত্তর খোঁজা প্রায় অর্থহীন।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। আমিও প্রয়োজনে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ বা কোনো বিষয় যাচাই করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিই। কিন্তু মৌলিক চিন্তা, বিশ্লেষণ এবং যুক্তির উৎস মানুষই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই চিন্তাকে সাজিয়ে তুলতে পারে, কিন্তু মানুষের নিজস্ব বিচারবোধের বিকল্প হতে পারে না।

যাই হোক, প্রত্যাশিত উত্তর না পেয়ে কার্ল পপারের সেই উক্তিটিই লেখার শুরুতে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে এই শিরোনামে আঘাত পেয়ে থাকেন, তাহলে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা নয়। বরং একজন সচেতন কমিউনিটি সদস্য হিসেবে একটি ভাষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় নিয়ে আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।

মূল প্রশ্নটি কী?

আমার প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত সরল ও নির্দিষ্ট। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষা যখন “কনস্যুলার সেবা”, তখন প্রচারণামূলক পোস্টারে তার পরিবর্তে “Passport Surgery” কেন ব্যবহার করা হচ্ছে?

পরিভাষার কি এতটাই সংকট দেখা দিয়েছে যে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি শব্দ বাদ দিয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি পরিভাষা ধার করতে হয়েছে?

যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি সহজভাবে উপস্থাপন করা, তাহলে কার্যক্রমের প্রকৃত অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শব্দ ব্যবহার করতে সমস্যা কোথায় ছিল?

বরং প্রশ্ন হচ্ছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম প্রাচীন পরিভাষা “Surgery”, যার মূল অর্থ অস্ত্রোপচার, সেটিকেই কেন বেছে নেওয়া হলো?

এটি কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা পদাধিকারীকে লক্ষ্য করে করা প্রশ্ন নয়। এটি সরকারি পরিভাষার যথাযথ ব্যবহার নিয়ে একটি ভাষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন।

বাংলাদেশ হাইকমিশন, লন্ডন যখন তাদের সরকারি নথি, ওয়েবসাইট এবং আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে ধারাবাহিকভাবে “Consular Services” ব্যবহার করছে, তখন সেই কার্যক্রমের সহযোগী সংগঠন ABAI কেন তার পরিবর্তে একটি ভিন্ন ও বিভ্রান্তিকর শব্দ ব্যবহার করছে?

কনস্যুলার সেবার আওতায় শুধু পাসপোর্ট নয়; এনভিআর, জন্মনিবন্ধন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, বিভিন্ন ধরনের প্রত্যয়ন বা অ্যাটেস্টেশন এবং আরও নানা প্রশাসনিক সেবা অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, পাসপোর্ট এই সেবার একটি অংশমাত্র। ফলে পুরো কার্যক্রমকে “Passport Surgery” নামে অভিহিত করা পরিভাষাগতভাবে কতটা যথাযথ, সেটিই ছিল আমার প্রশ্ন।

আমি ভেবেছিলাম, এই প্রশ্নের একটি সরাসরি উত্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু তার পরিবর্তে একের পর এক ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসতে শুরু করল।

‘MP Surgery’-এর সঙ্গে তুলনা

প্রথমে একজন অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার ভাই বললেন, এটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক পরিভাষা “MP Surgery”-এর মতো একটি ব্যবহার। তাঁর বক্তব্য ছিল, যেহেতু ব্রিটিশ ইংরেজিতে Doctor’s Surgery এবং MP Surgery বহুল ব্যবহৃত ও স্বীকৃত, তাই Passport Surgery ব্যবহারেও কোনো সমস্যা নেই।

সত্যিই, Doctor’s Surgery এবং MP Surgery ব্রিটিশ ইংরেজির সুপ্রতিষ্ঠিত idiomatic expression। এগুলোর নিজস্ব ভাষাগত ইতিহাস, ব্যবহারিক প্রেক্ষাপট এবং সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি রয়েছে।

কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত বাগধারার অস্তিত্ব কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তৈরি করা নতুন একটি শব্দবন্ধকে বৈধতা দেয়?

আমার কাছে এর উত্তর স্পষ্টভাবে না।

কারণ যুক্তিবিদ্যায় দুটি ভিন্ন বিষয়ের মধ্যে উপরিভাগের সাদৃশ্য দেখিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোকে False Analogy বা ভ্রান্ত উপমা বলা হয়। দুটি শব্দবন্ধে একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে বলেই তাদের অর্থ, প্রয়োগ কিংবা গ্রহণযোগ্যতা এক হয়ে যায় না।

রূপক ও বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিংয়ের যুক্তি

পরবর্তীতে ABAI-এর একজন সম্পাদক ভাই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বললেন, “Passport Surgery” আসলে একটি রূপক বা Metaphor। উদাহরণ হিসেবে তিনি “বিষাদ-সিন্ধু”, “চন্দ্রমুখ”, Auto Clinic, iPhone Doctor এবং Mr Price-এর মতো নাম উল্লেখ করলেন।

কিন্তু এখানেও একটি মৌলিক পার্থক্য উপেক্ষিত হয়েছে। তিনি যেসব উদাহরণ দিয়েছেন, সেগুলো হয় সাহিত্যিক অলঙ্কার, নয়তো বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং। সাহিত্য, বিপণন এবং ব্র্যান্ডিংয়ের ভাষা স্বভাবতই সৃজনশীল, রূপকধর্মী ও কল্পনাপ্রবণ হতে পারে। সেখানে শব্দচয়নের উদ্দেশ্য প্রায়ই আবেগ সৃষ্টি করা অথবা একটি ব্র্যান্ড-পরিচয় গড়ে তোলা।

কিন্তু সরকারি প্রশাসনিক কিংবা কূটনৈতিক পরিভাষার ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

রাষ্ট্রের সরকারি যোগাযোগে ব্যবহৃত ভাষার ভিত্তি হয় নির্ভুলতা (Precision), প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য (Official Terminology) এবং অর্থগত স্বচ্ছতা (Semantic Clarity)। সেখানে সাহিত্যিক স্বাধীনতা বা বাণিজ্যিক সৃজনশীলতার সুযোগ সীমিত।

সরকারি পরিভাষা কোনো সাহিত্য নয়, কোনো বিজ্ঞাপনও নয়। এটি একটি প্রশাসনিক যোগাযোগের মাধ্যম, যার প্রতিটি শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ, ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব রয়েছে।

Polysemy ও দীর্ঘ ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

এরপর আরেকটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা আসে ABAI-এর সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে। তিনি Polysemy, Cambridge Dictionary, Wikipedia, Business Surgery, Advice Surgery এবং Consular Surgery নিয়ে দীর্ঘ ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা উপস্থাপন করেন।

ভাষাবিজ্ঞানের এসব ধারণা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই আকর্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায়।

আমি জানতে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষা “কনস্যুলার সেবা” থাকা সত্ত্বেও ABAI কেন “Passport Surgery” ব্যবহার করছে?

এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তাঁর লেখায় পাইনি।

ভাষায় একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকতে পারে। ভাষাবিজ্ঞানে একে Polysemy বলা হয়। কিন্তু কোনো শব্দের একাধিক অর্থ থাকার অর্থ এই নয় যে সেই শব্দ যেকোনো প্রসঙ্গে ব্যবহার করা যাবে। ভাষার অর্থ সবসময় প্রসঙ্গনির্ভর। বিশেষ করে সরকারি যোগাযোগে শব্দচয়নের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য এবং অর্থগত স্বচ্ছতা অপরিহার্য।

এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা দরকার। আমি কখনো বলিনি যে MP Surgery ভুল। আমি কখনো বলিনি যে Advice Surgery ভুল। আমি কখনো বলিনি যে Surgery শব্দের চিকিৎসাবহির্ভূত ব্যবহার নেই।

আমার প্রশ্ন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষা “কনস্যুলার সেবা” বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও, তার পরিবর্তে “Passport Surgery” কেন ব্যবহার করা হচ্ছে?

এই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় মূল বিতর্কটি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেছে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। ধরা যাক, কোথাও Consular Surgery শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে। তবুও সেটি Passport Surgery-এর যথার্থতা প্রমাণ করে না। কারণ Consular এবং Passport সমার্থক নয়।

Consular Services একটি বিস্তৃত প্রশাসনিক সেবাকে বোঝায়, যার মধ্যে পাসপোর্ট একটি অংশমাত্র। অন্যদিকে Passport একটি নির্দিষ্ট নথি বা সেবাকে নির্দেশ করে। এই মৌলিক পার্থক্যটি ভাষাগত ও প্রশাসনিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।

যদি পুরো কার্যক্রমকে শুধু “Passport” শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে কার্যক্রমের প্রকৃত পরিধিই সংকুচিত হয়ে যায়।

তিন ব্যাখ্যার পারস্পরিক অসঙ্গতি

এই পুরো বিতর্কে আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে আরেকটি বিষয়। একই অবস্থানকে সমর্থন করতে তিনজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি তিন ধরনের সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্রথমজন বললেন, এটি MP Surgery-এর মতো একটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক পরিভাষার অনুসরণ। দ্বিতীয়জন বললেন, এটি একটি Metaphor বা সাহিত্যিক রূপক। তৃতীয়জন Polysemy, অভিধান, উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন উদাহরণ টেনে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন যে Surgery শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে।

এই তিনটি ব্যাখ্যার কোনোটিই একে অপরকে শক্তিশালী করেনি। বরং প্রতিটি ব্যাখ্যা যেন আগের ব্যাখ্যার ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করেছে।

এখানেই আমার মূল প্রশ্ন। একটি অবস্থান যদি সত্যিই শক্তিশালী হয়, তাহলে সেটিকে প্রতিষ্ঠা করতে বারবার যুক্তির ভিত্তি পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে কেন?

একটি শক্তিশালী যুক্তি সাধারণত একই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নতুন নতুন ব্যাখ্যার প্রয়োজন তখনই দেখা দেয়, যখন মূল যুক্তি নিজেই যথেষ্ট দৃঢ় নয়।

“A strong argument remains consistent; a weak argument keeps changing its justification.”

এই বক্তব্যটি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক বলে আমার মনে হয়েছে।

আমি আবারও পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমার উদ্দেশ্য কাউকে ভুল প্রমাণ করা নয়। আমার উদ্দেশ্য ছিল একটি মাত্র প্রশ্নের উত্তর জানা। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষা যখন “কনস্যুলার সেবা”, তখন একটি সহযোগী সংগঠন কেন তার পরিবর্তে “Passport Surgery” ব্যবহার করছে?

প্রশ্নটি ছিল ভাষা, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য নিয়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আলোচনা ধীরে ধীরে সেই মূল প্রশ্ন থেকে সরে গিয়ে অন্য বিষয়ের দিকে চলে গেছে।

সামাজিক সংগঠনের ভাষাগত দায়িত্ব

একটি প্রবাসী কমিউনিটির সামাজিক সংগঠন শুধু অনুষ্ঠান আয়োজন করে না। তারা একটি কমিউনিটির ভাষা, সংস্কৃতি, চিন্তাধারা এবং প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষ করে যখন কোনো সংগঠন বাংলাদেশ সরকারের একটি সরকারি কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে, তখন তাদের ব্যবহৃত ভাষাও সেই সরকারি মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।

কারণ সাধারণ মানুষ প্রথমে পোস্টারই দেখে, সরকারি নথি নয়। তাই পোস্টারে ব্যবহৃত শব্দই মানুষের কাছে কার্যক্রমের পরিচয় হয়ে ওঠে। যদি সেই পরিচয়ই বিভ্রান্তিকর হয়, তাহলে ভাষাগত সমস্যার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিভ্রান্তিও তৈরি হতে পারে।

আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের সরকারি প্রশাসনিক যোগাযোগে সাধারণত Consular Services, Passport Services, Passport Office, Passport Appointment, Consular Assistance কিংবা Embassy Services-এর মতো নির্ভুল পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। Passport Surgery ধরনের শব্দবন্ধ সরকারি প্রশাসনিক পরিভাষা হিসেবে প্রচলিত নয়।

এখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমরা যখন এমন একটি দেশে বসবাস করছি, যেখানে সরকারি যোগাযোগে শব্দচয়নের নির্ভুলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন আমরা নিজেরাই কেন একটি বিভ্রান্তিকর ও অনানুষ্ঠানিক শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে আগ্রহী হচ্ছি?

আমরা কি প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করছি? নাকি বিষয়টি নিয়ে কখনো গুরুত্ব দিয়েই ভাবিনি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে দেখা দরকার। কারণ একটি কমিউনিটির বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা প্রকাশ পায় শুধু বড় বড় আয়োজনের মাধ্যমে নয়; বরং ছোট ছোট বিষয়েও তারা কতটা নির্ভুল, দায়িত্বশীল এবং আত্মসমালোচনাপ্রবণ, তার মধ্য দিয়েও।

সমালোচনা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়

আমি বিশ্বাস করি, একটি সুস্থ সমাজে সমালোচনা কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। সমালোচনা হলো আত্মসমালোচনার একটি সুযোগ।

ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ভুল চিহ্নিত হওয়ার পর সেটি সংশোধন করতে পারাই পরিপক্বতার লক্ষণ।

যদি কোনো সমালোচনার জবাবে যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে উত্তর দেওয়া হয়, তাহলে সেই আলোচনা সমাজকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু যদি মূল প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয় কিংবা আলোচনাকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সত্য অনুসন্ধানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়।

ভাষার শুদ্ধতা কোনো ব্যক্তিগত অহংকারের বিষয় নয়। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার অংশ। বিশেষ করে সরকারি কার্যক্রম, জনসেবামূলক উদ্যোগ কিংবা কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে শব্দচয়ন কখনোই তুচ্ছ বিষয় হতে পারে না।

একটি শব্দ কখনো কখনো একটি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতারও পরিচয় বহন করে।

কার্ল পপারের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা

শেষে আবারও কার্ল পপারের কথায় ফিরে যেতে চাই। তিনি বলেছিলেন, প্রকৃত অজ্ঞতা জ্ঞানের অভাব নয়; বরং জ্ঞান অর্জন করতে অস্বীকার করাই প্রকৃত অজ্ঞতা।

এই উদ্ধৃতিটি দিয়ে আমি কাউকে ছোট করতে চাইনি। বরং একটি নীতিগত বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছি।

আমরা সবাই ভুল করতে পারি। ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠান, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি পরিণত সমাজের বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্নকে ভয় পাওয়া হয় না; বরং তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

যে সমাজে প্রশ্নকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে আলোচনা ধীরে ধীরে আবেগনির্ভর হয়ে ওঠে। আর যে সমাজে প্রশ্নকে সত্য অনুসন্ধানের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা হয়, সেখানে জ্ঞান, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক চর্চা সমৃদ্ধ হয়।

আমার প্রশ্ন আজও একই রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষা যখন “কনস্যুলার সেবা”, তখন প্রচারণামূলক পোস্টারে “Passport Surgery” ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কী?

যদি সত্যিই এই শব্দবন্ধের পেছনে কোনো ভাষাতাত্ত্বিক, প্রশাসনিক বা সরকারি ভিত্তি থেকে থাকে, তাহলে সেটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। সেই ব্যাখ্যা তথ্য, দলিল এবং গ্রহণযোগ্য ভাষাগত উৎসের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হলে তা অবশ্যই আলোচনাকে সমৃদ্ধ করবে।

কিন্তু যদি এমন কোনো ভিত্তি না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষায় ফিরে আসাই কি অধিক যুক্তিসঙ্গত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হবে না?

আমার বিশ্বাস, হবে।

কারণ “কনস্যুলার সেবা” শুধু একটি বাংলা অনুবাদ নয়। এটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষা, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও দূতাবাসগুলো তাদের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে ব্যবহার করে আসছে।

অন্যদিকে “Passport Surgery” এমন একটি শব্দবন্ধ, যা পুরো কনস্যুলার কার্যক্রমের প্রকৃত পরিধি প্রকাশ করে না। বরং এটি একটি নির্দিষ্ট সেবাকে পুরো কার্যক্রমের প্রতিনিধিত্বকারী শব্দ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা ভাষাগত ও প্রশাসনিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।

প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার প্রশ্ন

এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে বিব্রত করা নয়। বরং একটি সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া।

আমি বিশ্বাস করি, ভাষার শুদ্ধতা কেবল ভাষাবিদদের বিষয় নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বেরও পরিচয়। যে সংগঠন মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের ব্যবহৃত ভাষাও মানুষের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়। সেই বার্তা যত বেশি নির্ভুল, সুসংগত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতাও তত বেশি শক্তিশালী হবে।

আমাদের কমিউনিটি আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়। আমাদের ভাষা, চিন্তা, যুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণও সমানভাবে পরিণত হওয়া প্রয়োজন।

কারণ আমরা এখন এমন একটি দেশের অংশ, যেখানে সরকারি যোগাযোগ, প্রশাসনিক ভাষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। আমাদেরও সেই মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত।

আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, এই লেখাটি ব্যক্তিগত বিরোধের অংশ হিসেবে নয়, বরং একটি গঠনমূলক আলোচনার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি এই আলোচনা ভবিষ্যতে সরকারি পরিভাষার আরও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সামান্যও ভূমিকা রাখে, তাহলেই এই লেখার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে বলে মনে করব।

কারণ একটি সমাজের শক্তি শুধু তার আয়োজন, জনসমাগম কিংবা জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সমাজের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সত্যকে গ্রহণ করার সাহসে, যুক্তিকে সম্মান করার সংস্কৃতিতে এবং প্রয়োজনে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার মানসিকতায়।

পরিশেষে, আমার প্রশ্নটি আবারও স্পষ্টভাবে রেখে যেতে চাই।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিভাষা “কনস্যুলার সেবা” বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও, ABAI কি ভবিষ্যতে তাদের প্রচারণামূলক পোস্টারে “Passport Surgery” শব্দবন্ধের পরিবর্তে সরকারি পরিভাষাটি ব্যবহার করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল একটি শব্দের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। এটি আমাদের কমিউনিটির ভাষাগত সচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ এবং যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনার সংস্কৃতি সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।

Enter চাপুন বা বাটনে ক্লিক করুন  ·  ESC দিয়ে বন্ধ করুন

EN
বিশ্ব কমিউনিটি বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ড খেলাধূলা তথ্য প্রযুক্তি